গভীর সমুদ্রতলে খননের চিন্তা করাই যেখানে কঠিন, সেখানে খরচ নির্ধারণের ব্যাপারটি আরও কঠিন। সবুজ প্রযুক্তিতে বৈশ্বিক রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর চাহিদার কারণে বহু দেশ ও সংস্থা সমুদ্রতলের দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এই সমুদ্রতল মূলত এক অনাবিষ্কৃত এলাকা; যেখানে কোবাল্ট, তামা, স্বর্ণ ও বহুধাতব নুড়ির (বহু উপাদানের তৈরি ধাতব পিণ্ড) ভান্ডার রয়েছে। এসব বিষয়ে বিজ্ঞান এখনও অনেক কম জানে। এমনকি এই খনিজগুলো উত্তোলন করতে কত খরচ ও গভীর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ওপর কী প্রভাব পড়বে, আধুনিক বিজ্ঞান আজও তা জানে না।
ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের অধ্যাপক অ্যাড্রিয়ান গ্লোভারের নেতৃত্বে পরিচালিত এবং ‘কারেন্ট বায়োলজিতে প্রকাশিত একটি নতুন পর্যালোচনায় ২০০টিরও বেশি গবেষণা প্রতিবেদন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছে। এসব গবেষণা পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে করা হয়। তবে পর্যালোচনার ফল হতাশাজনক। এর কারণ হলো, ‘বিজ্ঞান এসব ব্যাপারে এখনও অল্পই জানে।’
অধ্যাপক গ্লোভার বলেন, ‘এটা আশ্চর্যজনক যে, এত বড় একটি পরিবেশগত সমস্যা এখনও বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে ব্যাপকভাবে পর্যালোচনা করা হয়নি। আমরা গভীর সমুদ্র খননের পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কিত বহু প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছি। অধিকাংশই অজানা থেকে গেছে।’
পৃথিবীপৃষ্ঠের অর্ধেকেরও বেশি অংশজুড়ে রয়েছে গভীর সমুদ্র। আর এই সমুদ্র তলদেশের পরিবেশই এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ‘কম জানা’ বিষয়। সমুদ্রতলে তিন হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় রয়েছে হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল পলিময় অঞ্চল। এই অঞ্চলে রয়েছে পলিকেট কৃমি (সামুদ্রিক কৃমি), ক্রাস্টেসিয়ান (শক্ত খোলসযুক্ত প্রাণী), একাইনোডার্ম (কাঁটাযুক্ত ত্বকবিশিষ্ট প্রাণী) এবং স্পঞ্জ (নরম ছিদ্রযুক্ত প্রাণী)। এগুলোকে বিজ্ঞান এখনও স্পষ্টভাবে জানতে পারেনি। তাছাড়া সমুদ্রতলে ছড়িয়ে থাকা হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট বা গভীর ফাটলগুলোতে থাকে টিউব ওয়ার্ম (সূর্যালোক ছাড়াই বাঁচতে পারা প্রাণী), কাঁকড়া, চিংড়ি এবং শামুক; যেগুলো বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখে। এসব বিষয়েও খুব কম জানতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা।
সমুদ্রের অতলে বিশাল সমভূমি বহু ধাতব নুড়িতে পরিপূর্ণ থাকে। অন্যদিকে হাইড্রোথার্মাল ভেন্টগুলো কোবাল্ট, স্বর্ণ ও তামায় আবৃত থাকে। ফলে গভীর সমুদ্রতল এখন খনি শিল্পের জন্য ক্রমবর্ধমান আকর্ষণীয় লক্ষ্য হয়ে উঠেছে। এসব খনির খননকাজ অনিবার্যভাবে সমুদ্রের জীববৈচিত্র্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। অতল সমভূমি একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত জানা গেলেও ভেন্টগুলোর অবস্থা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা কিছু জানেন না বললেই চলে।
অধ্যাপক গ্লোভার বলেন, ‘বহুধাতব নুড়ি, হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট এবং সমুদ্রশৈল থেকে খনিজ উত্তোলনের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ভিন্নতা রয়েছে। এই ব্যবস্থাগুলো একটির থেকে আরেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাছাড়া সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটানো বৈজ্ঞানিকভাবে নিষিদ্ধ।
গভীর সমুদ্রে খনন সম্ভব হলেও এর জন্য কয়েক দশক সময় লাগতে পারে। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা রয়েছে। তারা একটি সংরক্ষিত এলাকা ইতোমধ্যে নির্ধারণ করে দিয়েছে।
অধ্যাপক গ্লোভার বলেন, সমুদ্রতলে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের ঝুঁকি নিরসনের বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের ব্যাপারটি অনেকাংশেই অজানা। গভীর সমুদ্রের প্রাণীগুলোর আবাসস্থলগুলোর অপরিবর্তনীয় প্রকৃতির ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের জানার বড় ঘাটতি রয়েছে। তাছাড়া খনন পরিচালনায় সরকারি কিংবা কূটনৈতিক অনুমোদনের বিষয়ও রয়েছে। মূল কথা হলো, বিজ্ঞানীরা এখনও এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রস্তুত নন। জ্ঞানের ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত গভীর সমুদ্র খননের প্রকৃত খরচ কত, তা অজানাই থেকে যাবে। ওশানোগ্রাফিক ম্যাগাজিন।





