হিমালয়ের পাদদেশ থেকে নেমে আসা কাদা, পাথর ও পানির ভয়ংকর স্রোত যখন মুহূর্তের মধ্যে ঘরবাড়ি গিলে খাচ্ছিল, তখন স্ত্রীকে বাঁচাতে জীবনের শেষ চেষ্টা করেছিলেন নেপালের ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল। কিন্তু সেই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। চোখের সামনেই প্রবল কাদার স্রোতে ভেসে যান তার স্ত্রী।
ভয়াবহ এই দুর্যোগ থেকে প্রাণে বেঁচে গেলেও এখন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কেশব। নিরাপদে উদ্ধার হওয়ার পরও তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে সেই বিভীষিকাময় মুহূর্ত—যখন স্ত্রীকে শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করেও শেষ পর্যন্ত তাকে রক্ষা করতে পারেননি তিনি।
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ কাদা ও পাথরধসের পর সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিশাল আকারের কাদা ও পাথরের ধস নদীতে আছড়ে পড়ার পর মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়। সেই স্রোত শহর, গ্রাম ও বিস্তীর্ণ উপত্যকাজুড়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
বন্যা ও কাদার স্রোতে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক, স্থাপনা ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ।
নিখোঁজদের সন্ধানে বৃহস্পতিবারও ব্যাপক উদ্ধার অভিযান চালানো হয়। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে আকাশপথে তল্লাশি চালান উদ্ধারকারীরা। ধ্বংসস্তূপ, কাদার স্তর এবং নদী ও উপত্যকার আশপাশে নিখোঁজদের সন্ধান করা হচ্ছে।
নিখোঁজ শত শত পর্যটক
দুর্যোগে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক পর্যটক ও তীর্থযাত্রীও নিখোঁজ হয়েছেন। নেপালের পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিখোঁজ ৫৭৯ পর্যটকের মধ্যে ৪০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুর্গত অঞ্চলটি ট্রেকার, পর্বতারোহী ও কৈলাস তীর্থযাত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হওয়ায় সেখানে বিপুলসংখ্যক বিদেশি পর্যটক অবস্থান করছিলেন।
নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান আবারও শুরু হয়েছে। এখনো দুর্গম অনেক এলাকায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তাই আরও মরদেহ উদ্ধারের আশঙ্কা রয়েছে। তার মতে, নিহতের সংখ্যা ১৬২-এর বেশি হতে পারে।
নেপাল পর্যটন বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৪ জন রয়েছেন।
তিব্বতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি
শুধু নেপাল নয়, চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকাতেও ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তিব্বতের গিয়েরং কাউন্টিতে কাদা ও পাথরধসের ঘটনায় ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।
তবে নেপাল ও চীনের প্রকাশ করা নিখোঁজের হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তিদের নাম রয়েছে কি না, তাৎক্ষণিকভাবে তা পরিষ্কার হয়নি। ফলে প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা নির্ধারণে আরও যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে।
যাচাইকৃত বিভিন্ন ভিডিওতে দুর্যোগের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, গিয়েরং সীমান্ত পারাপার এলাকায় প্রচণ্ড গতিতে পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ নিচের দিকে নেমে আসছে। প্রবল স্রোতের তোড়ে মানুষ ও বিভিন্ন স্থাপনা ভেসে যাচ্ছে। নেপালের নিচের দিকের বিভিন্ন এলাকাতেও ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘স্ত্রীকে বাঁচাতে তার হাত ধরেছিলাম’
হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে কেশব প্রসাদ বারাল সেই ভয়াবহ রাতের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বারবার আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন।
তিনি জানান, বিশাল কাদার ঢল তাদের বাড়ির দিকে দ্রুত এগিয়ে আসছিল। স্রোত যত কাছে আসছিল, কাদার স্তরও তত উঁচু হচ্ছিল। একপর্যায়ে কাদা তাদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে কেশব তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়ির ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন। তিনি স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, যেভাবেই হোক তাকে নিরাপদে ছাদে নিয়ে যাওয়া।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্রবল কাদার স্রোতের টানে তিনি স্ত্রীর হাত ধরে রাখতে পারেননি। চোখের সামনেই কাদার ঢল তার স্ত্রীকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর প্রায় চার ঘণ্টা ধরে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন কেশব। শেষ পর্যন্ত একটি হেলিকপ্টার তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। তবে তার স্ত্রীকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ভাঙা কণ্ঠে কেশব বলেন, তার স্ত্রী আর নেই। কোথাও কাদার নিচে তিনি পড়ে আছেন—এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া তার জন্য অত্যন্ত কঠিন।
গাছ আঁকড়ে প্রাণ বাঁচালেন আরেকজন
দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া আরেক ব্যক্তি জানান, কাদার ভয়ংকর স্রোত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে তিনি একটি আমগাছ শক্ত করে আঁকড়ে ধরেছিলেন। প্রবল স্রোতের মধ্যে গাছটি আঁকড়ে ধরেই তিনি মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।
কিন্তু গাছের সঙ্গে ঝুলে থাকা অবস্থায় নিজের চোখের সামনে তিনি দেখেন, যেখানে কাজ করছিলেন সেই বাড়িটি মুহূর্তের মধ্যে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভেসে যায়।
এই ভয়াবহ দুর্যোগে স্বজন হারানো মানুষের আহাজারি, নিখোঁজদের সন্ধানে অপেক্ষা এবং ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকারীদের তৎপরতায় হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চলজুড়ে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। উদ্ধারকারীরা আশাবাদী, ধ্বংসস্তূপ ও দুর্গম এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালিয়ে আরও জীবিত মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
desk news 



















