গাজীপুরের কাপাসিয়ায় অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সময় আতাউর রহমান আতা (৫০) নামে এক চালককে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তার বৃদ্ধ মা জহুরা খাতুনও মারা গেছেন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। একই পরিবারের দুই সদস্যের মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
রাতে উপজেলার সনমানিয়া ইউনিয়নের মির্জানগর-শিমুলতলী এলাকার মির্জানগর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন সড়কের পাশ থেকে আতাউর রহমানের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি উপজেলার ঘাগটিয়া চালার বাটনা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। জীবিকার তাগিদে তিনি অটোরিকশা চালাতেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সন্ধ্যার পর মির্জানগর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের শিমুলতলী সড়কের একটি নির্জন স্থানে আতাউর রহমানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা। পরে তারা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে বিষয়টি পুলিশকে জানান।
খবর পেয়ে কাপাসিয়া আড়াল বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করেন। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে নিহতের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এ কারণে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ।
তবে আতাউর রহমানকে কীভাবে, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে হত্যা করেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
অটোরিকশা ছিনতাইয়ের সন্দেহ
নিহতের স্বজনদের ধারণা, যাত্রীবেশে দুর্বৃত্তরা আতাউর রহমানের অটোরিকশা ভাড়া করার কথা বলে তাকে নির্জন ওই এলাকায় নিয়ে যায়। পরে অটোরিকশাটি ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।
নিহতের স্বজন মাসুদ রানা বলেন, আতাউর রহমান অত্যন্ত সৎ, সহজ-সরল ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন। প্রতিদিনের মতো তিনি অটোরিকশা নিয়ে জীবিকার জন্য বের হয়েছিলেন। কিন্তু রাতে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে।
তিনি বলেন, পরিবারের সদস্যরা ধারণা করছেন, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই আতাউর রহমানকে নির্জন স্থানে নিয়ে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে পুলিশ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করবে বলে আশা করছেন তারা।
ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে মায়ের মৃত্যু
আতাউর রহমানের মৃত্যুর খবর বাড়িতে পৌঁছানোর পর তার বৃদ্ধ মা জহুরা খাতুন শোকে অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। পরে তার মৃত্যু হয়।
মাসুদ রানা দাবি করেন, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে জহুরা খাতুন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। এতে পরিবারটির ওপর নেমে আসে আরও বড় শোক।
স্বজনদের দাবি, একই পরিবারের দুই সদস্যের মরদেহ দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাদের জন্য পাশাপাশি দুটি কবরও খনন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তারা।
তবে জহুরা খাতুনের মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
কাপাসিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ নাছির আহমদ বলেন, ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে তার মা জহুরা খাতুনের মৃত্যুর বিষয়টি তিনি অবগত নন।
চারজনকে আটকের দাবি
এদিকে নিহতের স্বজনদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রাসেলসহ চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। তবে পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
স্বজনদের এই দাবির বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তের স্বার্থে পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে কি না, সেটিও আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
পুলিশের বক্তব্য
কাপাসিয়া আড়াল বাজার পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। মির্জানগর বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের পাশের শিমুলতলী সড়কের একটি ফাঁকা জায়গা থেকে অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি জানান, নিহতের মাথায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
কাপাসিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ নাছির আহমদ বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে। নিহতের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
নির্জন সড়কে মরদেহ উদ্ধারে চাঞ্চল্য
মির্জানগর-শিমুলতলী এলাকার নির্জন সড়কের পাশ থেকে অটোরিকশাচালকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচল তুলনামূলক কম থাকায় ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের ধারণা, আতাউর রহমানকে কোনোভাবে ওই নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর তার ওপর হামলা চালানো হয়ে থাকতে পারে। পরে তার অটোরিকশাটি নিয়ে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে গেছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো কিছু নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
তদন্তে বেরিয়ে আসবে প্রকৃত ঘটনা
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থলের আলামত এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
অটোরিকশাটি উদ্ধার হয়েছে কি না, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত এবং ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই আতাউর রহমানকে হত্যা করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
এদিকে একই পরিবারের মা ও ছেলের অল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবারের পরিবেশ।
নিহত আতাউর রহমানের মৃত্যুর কারণ ও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে পুলিশের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে তার মা জহুরা খাতুনের মৃত্যুর বিষয়টিও স্বজনদের দাবির ভিত্তিতে জানা গেছে; পুলিশ বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
গাজীপুর প্রতিনিধি 



















