
ভয়াবহ বন্যায় নিখোঁজ হয়ে যাওয়া একমাত্র ছেলেকে খুঁজতে মাত্র ২ হাজার নেপালি রুপি ধার করে দুর্গম পাহাড়ি পথ পাড়ি দিচ্ছেন নেপালের এক অসহায় বাবা। সঙ্গে রয়েছেন তার ভাই। অর্থের সংকট, ক্ষুধা, ক্লান্তি ও শারীরিক যন্ত্রণা—কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। ছেলেকে জীবিত অথবা মৃত অবস্থায় একবার দেখার আশাতেই দিনের পর দিন ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হৃদয়বিদারক এই ঘটনা।
নিখোঁজ তরুণের বাবা তালকা সদা নেপালের তেরাই অঞ্চলের সপ্তরি জেলার বাসিন্দা। তার একমাত্র ছেলে ১৯ বছর বয়সী বিনোদ। গত ২৬ আগস্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে উত্তর নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হলে সেই সময় থেকেই বিনোদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
কাজের সন্ধানে গিয়ে নিখোঁজ বিনোদ
পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে প্রায় এক মাস আগে কাজের সন্ধানে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন বিনোদ। তিনি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রাসুয়া জেলায় গিয়ে একটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন।
বন্যার ঠিক এক দিন আগে ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ কথা হয় তালকা সদার। এরপর থেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। একমাত্র ছেলের কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন বাবা নিজেই তাকে খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন।
ভাইকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হয় দীর্ঘ ও কষ্টকর যাত্রা। পরনে বিবর্ণ সাদা শার্ট, কালো প্যান্ট। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে শরীরে জড়িয়ে নিয়েছেন কমলা রঙের একটি পলিথিন। কাঁধে ছোট ধূসর ব্যাগ। সঙ্গে থাকা অর্থের পরিমাণও অতি সামান্য।
ধার করা টাকাই শেষ সম্বল
ছেলেকে খুঁজতে যে টাকা নিয়ে বের হয়েছেন, সেটিও নিজের নয়। ধার করে সংগ্রহ করেছেন ২ হাজার নেপালি রুপি। প্রতি ১০০ রুপি ধার নেওয়ার বিপরীতে তাকে ২০ রুপি সুদ দিতে হবে।
এই অল্প টাকার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে যাতায়াতের পেছনে খরচ হয়ে গেছে। সপ্তরি থেকে কাঠমান্ডু পর্যন্ত বাসে যেতে হয়েছে তাকে। প্রায় ২৯২ কিলোমিটার এই পথ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে পাড়ি দিতে প্রায় ৯ ঘণ্টা সময় লাগে।
কাঠমান্ডুতে পৌঁছে তিনি একের পর এক হাসপাতাল ঘুরেছেন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উত্তরাঞ্চল থেকে উদ্ধার করা আহত ও মৃত অনেক মানুষকে রাজধানীতে নেওয়া হয়েছিল। হাসপাতাল ও মর্গে থাকা মৃতদের ছবিও তিনি দেখেছেন। প্রতিটি মুখের মধ্যে খুঁজেছেন নিজের ছেলেকে।
কিন্তু কোথাও বিনোদের সন্ধান পাননি।
এরপর শুরু আরও কঠিন পথ
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের নুয়াকোটের দিকে এবার হাঁটা শুরু করেন দুই ভাই। ছেলের কর্মস্থলের কাছাকাছি পৌঁছানোর আশায় ভাঙাচোরা রাস্তা ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ে হেঁটে তারা ত্রিশুলি শহরে পৌঁছান।
বন্যার ভয়াবহতায় ত্রিশুলি শহরের বিভিন্ন এলাকা তখনও বিপর্যস্ত। সড়কের ওপর পড়ে আছে ধ্বংসাবশেষ। কোথাও জমে আছে কাদা ও পলি। বাজার ও আশপাশের এলাকাগুলোতেও বন্যার ক্ষত স্পষ্ট।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছেলের খোঁজ করছেন তালকা সদা।
এক রাতের খাবারেও মেটেনি ক্ষুধা
সদা জানান, আগের রাতে একটি লজে থাকার জন্য তাকে ১ হাজার ৫০০ নেপালি রুপি দিতে হয়েছে। এত টাকা খরচ করার পরও খাবার হিসেবে পেয়েছেন সামান্য ভাত। তাতেও তাদের ক্ষুধা মেটেনি।
তার ভয়, আর এক রাত সেখানে থাকলে হাতে থাকা শেষ টাকাটুকুও শেষ হয়ে যাবে। তখন ছেলেকে খোঁজা তো দূরের কথা, বাড়ি ফেরার পথের খরচও থাকবে না।
তারপরও ছেলের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত ফিরে যেতে চান না তিনি।
‘ছেলে মৃত হলেও একবার দেখতে চাই’
ছেলের সন্ধানে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন তালকা সদা। তার দাবি, মরদেহ রাখা মর্গ কিংবা উদ্ধারকাজে থাকা সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে যেতে চাইলেও তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সদার অভিযোগ, তারা তেরাই অঞ্চলের মাধেশি ও প্রান্তিক মুসাহার সম্প্রদায়ের মানুষ হওয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, তারা দরিদ্র এবং নেপালি ভাষায় সাবলীলভাবে কথা বলতে পারেন না। এ কারণে তাদের সঙ্গে যথাযথ আচরণ করা হচ্ছে না বলে তার অভিযোগ।
তার আকুতি, ছেলে যদি বেঁচে না-ও থাকে, অন্তত তার মরদেহটি যেন পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। নিজের সন্তানের শেষ মুখটি দেখার অধিকারটুকু তিনি চান।
ভয়াবহ দুর্যোগে বিপুল প্রাণহানি
গত ২৬ আগস্টের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপালের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বহু ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক, স্কুল ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হন।
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দুর্যোগের ভয়াবহতার মধ্যেও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তবে দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল, ধ্বংস হয়ে যাওয়া সড়ক এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে উদ্ধার তৎপরতায় নানা বাধা তৈরি হয়েছে।
এই বিপর্যয়ের মধ্যে হাজারো পরিবারের মতো তালকা সদার পরিবারও অপেক্ষায়—একটি খবরের জন্য। সেই খবর হতে পারে বিনোদ জীবিত আছেন, অথবা হতে পারে তার মরদেহের সন্ধান মিলেছে।
কিন্তু সন্তানের খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত থামতে নারাজ এই বাবা। পকেটে সামান্য টাকা, শরীরে ক্লান্তি আর সামনে ধ্বংসস্তূপে ভরা পাহাড়ি পথ—সবকিছুকে পেছনে ফেলে তিনি শুধু একটাই আশায় এগিয়ে চলেছেন, ‘ছেলেকে একবার খুঁজে পাব।’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 



















