প্রথম পাতা বাংলাদেশ চট্টগ্রামে গ্যাস লিকেজ থেকে ৬ বছরে ৮০০ আগুন-বিস্ফোরণ
চট্টগ্রামে গ্যাস লিকেজ থেকে ৬ বছরে ৮০০ আগুন-বিস্ফোরণ
চট্টগ্রামে গ্যাস লিকেজ থেকে ৬ বছরে ৮০০ আগুন-বিস্ফোরণ - সংরক্ষিত ছবি।

বাংলাদেশ
চট্টগ্রামে গ্যাস লিকেজ থেকে ৬ বছরে ৮০০ আগুন-বিস্ফোরণ
হালিশহরের ঘটনায় আরও দুজনের মৃত্যু
চট্টগ্রাম বিভাগে গত ছয় বছরে গ্যাসলাইন লিকেজে আট শতাধিক অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে এসব ঘটনায় কতজন প্রাণ হারিয়েছেন, সেই হিসাব নেই কারও কাছে। প্রতিটি বড় ঘটনার পর তদন্ত কমিটি হয়। তারা কিছু সুপারিশ দেয়। কিন্তু এর কোনোটাই বাস্তবায়ন হয় না।

২০১৯ সালেও কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। সে বছর চট্টগ্রামের পাথরঘাটায় গ্যাসলাইন লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণে প্রাণ হারান সাতজন। তখন পাঁচ সুপারিশের মধ্যে ছিল– কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আওতাধীন গ্যাসলাইন ও রাইজারগুলো নিয়মিত পরীক্ষা, গ্যাস নিঃসরণ চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং নগরবাসীর মধ্যে সচেতনতামূলক প্রচারণা কার্যক্রম জোরদার করা। এসব সুপারিশের কোনোটিই বাস্তবায়ন করেনি কেজিডিসিএল। এর ফলে বাড়ছে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা।সর্বশেষ গত সোমবার ভোরে চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর এলাকায় বিস্ফোরণে ৯ জন দগ্ধ হয়েছেন। এর মধ্যে গতকাল মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত মারা গেছেন চারজন। তারা হলেন– নূরজাহান বেগম রানী (৪০), তাঁর ছেলে মো. শাওন (১৬), দেবর সামির আহমেদ (৪০) ও তাঁর স্ত্রী আশুরা আক্তার পাখি (৩০)। দগ্ধ বাকিদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। তারা রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন। সর্বশেষ গতকাল রাত পৌনে ১১টার দিকে আশুরা আক্তার পাখি ওই হাসপাতালে মারা যান। এর আগে সকালে শাওন ও দুপুরে তাঁর চাচা সামির মারা যান।

মৃত চারজনের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বাগমারা গ্রামে। তাদের মৃত্যুর খবরে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। সামিরের ফুফাতো ভাই জামশেদ আলম বলেন, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে বরুড়ায় শাওন ও সামিরের মরদেহ এনে গ্রামে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে। সোমবার চট্টগ্রামে নূরজাহানকে দাফন করা হয়।
চট্টগ্রামে ২০২০ সালে ১০৭টি, ২০২১ সালে ১২৯টি, ২০২২ সালে ১৬৪টি, ২০২৩ সালে ১৯৯টি ও ২০২৪ সালে ৯৫টি লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০২৫ সালে শতাধিক লিকেজজনিত অগ্নিকাণ্ড ঘটে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছয় কারণে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটছে। সেগুলো হলো– পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন পরিবর্তন না করা, পাইপলাইন নিয়মিত মনিটর না করা, গ্যাস চুরির উদ্দেশ্যে অননুমোদিত সংযোগ নেওয়া, ফুটো পাইপ মেরামতে অপেশাদার শ্রমিক ব্যবহার, আবদ্ধ ঘরে গ্যাসের ভয়াবহতা সম্পর্কে নগরবাসীকে অবহিত না করা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি। এসব মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলা হয় না। দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধেও কখনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হালিশহরের ঘটনা তদন্তে দুই কমিটি
হালিশহরে গ্যাস বিস্ফোরণের পর আগুন লেগে ৯ জন দগ্ধ হওয়ার ঘটনা তদন্তে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মঙ্গলবার কেজিডিসিএল ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি করার কথা জানানো হয়। কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) কবির উদ্দিন আহমদ বলেন, দুর্ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। কমিটি দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখবে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। গ্যাসের রাইজার অক্ষত পাওয়া গেছে। কী কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্ত কমিটি বের করবে।’ তবে কেজিডিসিএলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কবির উদ্দিন।

হালিশহরের ঘটনাটি গ্যাস লিকেজজনিত বলে ধারণা ফায়ার সার্ভিসের। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্ল্যাটটিতে কেজিডিসিএলের লাইন সংযুক্ত ছিল। সম্ভবত চুলা থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে রান্নাঘরে জমে ছিল এবং সেই জমে থাকা গ্যাস থেকেই বিস্ফোরণের সূত্রপাত। এতে বাসিন্দারা দগ্ধ হন।
আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আলমগীর হোসেন জানান, জমে থাকা গ্যাস থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কী কারণে এমন ভয়াবহ বিস্ফোরণ, তা জানতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করবে।

বাড়াতে হবে নজরদারি
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির বলেন, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে নজরদারি বাড়াতে হবে। গ্যাসলাইনে কোনো লিকেজ আছে কিনা নির্দিষ্ট সময় পরপর পরীক্ষা করতে হবে। একই সঙ্গে মানুষকে সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা চালাতে হবে। তা ছাড়া মানুষকেও সচেতন হতে হবে। গ্যাস ব্যবহারের আগে যেন দরজা-জানালা খুলে দেওয়া হয়।

কেজিডিসিএলের সহকারী ব্যবস্থাপক (জনসংযোগ শাখা) কুতুবুর রহমান বলেন, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিতে মাঝে মধ্যে পত্রিকা ও কেবল টিভি অপারেটরদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এ ছাড়া মাইকিং করা হয়, যাতে মানুষ সচেতন হয়।

তবে নগরের একাধিক বাসিন্দার কাছ থেকে জানতে চাইলে তারা কেজিডিসিএলের এমন প্রচারণা কখনও শোনেননি বলে জানান। পাঁচলাইশের বাসিন্দা রোকসানা আক্তার বলেন, গ্যাসের নিরাপদ ব্যবহার নিয়ে কখনও মাইকিং করতে দেখিনি। শুনিওনি। তবে নিজে থেকে সতর্ক থাকার চেষ্টা করি।

তিন মন্ত্রণালয়ের বৈঠক শিগগির
দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস লিকেজ ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনা অব্যাহত থাকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারে শিগগির বৈঠকে বসছে স্বাস্থ্য, শিল্প ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন হালিশহরের ঘটনায় দগ্ধদের গতকাল দেখতে গিয়ে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী গ্যাসের আগুনকে ‘মানবসৃষ্ট দুর্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশে সারাবছরই কোথাও না কোথাও গ্যাস লিকেজজনিত দুর্ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। গ্যাস লিকেজ প্রতিরোধ এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডারের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আসাদুল হাবিব আরও বলেন, গ্যাস লিকেজ থেকে দুর্ঘটনা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যেসব সিলিন্ডার ব্যবহার করা হয়, কীভাবে তা একটা নিয়মের মধ্যে নিয়ে আসা যায়, সেগুলো নিয়ে আমরা অল্প সময়ের মধ্যে তিন মন্ত্রণালয় বসে কাজ করব; যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়, সেই ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, তিন মন্ত্রণালয় শিগগির বৈঠকে বসবে। এটাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় বা লিকেজ থাকলে কীভাবে দ্রুত দূর করা যায়, সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x