এসপিদের সঙ্গে আইজিপির বৈঠক
দেশের প্রতিটি জেলায় একটি ‘জিরো কমপ্লেইন (অভিযোগশূন্য) থানা’ গড়ে তোলার কথা ভাবছে পুলিশ। গতকাল সোমবার ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারের সঙ্গে পুলিশের নবনিযুক্ত মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের ভার্চুয়াল বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে জিরো কমপ্লেইন থানার ধারণা, কীভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, সেসব বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন আইজিপি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বৈঠকে আইজিপি বলেন, আইনশৃঙ্খলা ঠিক না হলে বিনিয়োগ আসবে না। হবে না কর্মসংস্থান।
এ সময় ‘মব কালচার’ বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা প্রক্রিয়াগত সমস্যার কারণে পুলিশ নিজেদের ভাবমূর্তি ঊর্ধ্বমুখী করতে পারছে না বলে উল্লেখ করেন আইজিপি। তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে কেউ ডাক দিলে অনেক লোক রাস্তায় জড়ো হচ্ছে, মব হচ্ছে। যারা জড়ো হচ্ছে তারা কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকলে মব কালচার বা এ ধরনের পরিস্থিতি হতো না। তাই বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে পুলিশের ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, প্রতিটি জেলার সদর থানাকে জিরো কমপ্লেইন থানা হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন আইজিপি। তিনি বলেছেন, একজন সার্কেল অফিসার ওই থানার কার্যক্রম সার্বক্ষণিক তদারক করবেন।
এ সময় আইজিপি আরও বলেন, প্রচলিত পুলিশিংয়ের বাইরে গিয়ে জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে। থানায় যে ধরনেরই লোক আসুক, তারা যেন পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিতে না পারে সেদিকে মনোযোগী হতে হবে। মানুষ কষ্ট নিয়ে থানায় এসে যাতে হাসিমুখে ফেরত যায়, এটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের।
আইজিপি মনে করেন, জিরো কমপ্লেইন থানা গড়ে তোলা গেলে পুলিশের বিরুদ্ধে যে অপবাদ তা ধীরে ধীরে দূর হবে। জেলার একটি থানাকে এইভাবে গড়ে তোলা গেলে পুরো জেলায় তার বার্তা ছড়িয়ে পড়বে। উদাহরণ দিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, একসময় একজন হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ এলাকায় গেলে সম্মান বা ভয়ে হোক, এলাকা ফাঁকা হয়ে যেত।
তিনি জানান, জিরো কমপ্লেইন থানায় মাসে দু-একদিন পুলিশ সুপার যাবেন। জনগণের সঙ্গে কথা বলবেন। এক পর্যায়ে জিরো কমপ্লেইন থানা গড়ে তোলার ব্যাপারে পুলিশ সুপারের কাছে নিশ্চয়তা চান আইজিপি। পাশাপাশি ১২ থেকে ১৫টি বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন তিনি। চাঞ্চল্যকর ঘটনা দ্রুতই পুলিশ সদরদপ্তরকে অবহিত করার কথা বলেছেন। অনেক সময় দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও কার্যকর উদ্যোগ নিতে বিলম্ব হয়। এটি যেন না হয়, সেটি স্মরণ করিয়ে দেন। এ ছাড়া চাঞ্চল্যকর ঘটনার ব্যাপারে ন্যূনতম কম সময়ের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
চাঁদাবাজদের ক্ষেত্রে ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো দলীয় বিবেচনা প্রাধান্য পাবে না বলে স্মরণ করিয়ে দেন আইজিপি। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, মহাসড়কে ডাকাতি, ছিনতাই হচ্ছে। বগুড়াসহ কয়েকটি জায়গায় এটি ঘটেছে। আসছে ঈদে এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবে ঘটতে দেব না।
ঈদের আগে পোশাক শিল্পে বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিক অসন্তোষের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে মালিকসহ সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠক করে সুরাহা করার কথা বলেন পুলিশ মহাপরিদর্শক।
বৈঠকে পুলিশ মহাপরিদর্শক আরও বলেন, মামলার তদন্তের মান বাড়াতে হবে। তদন্তের জন্য আলাদা উইং গঠনের চিন্তাভাবনা ছিল। আমরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দেওয়ার পর সেটি হয়নি। এখন তদন্তের মান বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। থানায় যে আলাদা তদন্ত উইং রয়েছে, তারা প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এটির মান বাড়াবে। সিআইডি ও পিবিআইর সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্তের মান বাড়ানোর কথা বলেন তিনি।
বৈঠকে আইজিপি উগ্রবাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন। বিশেষভাবে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের দিকে নজর দিতে বলেছেন, যাতে এসব জেলা থেকে কেউ উগ্রবাদী সংগঠনে না জড়ায়। এরই মধ্যে এসব জেলার কেউ কেউ বিভিন্ন সংগঠনে সম্পৃক্ত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। দেশের নিরাপত্তায় এ ধরনের সমস্যার শুরুতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন আইজিপি। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) কাছ থেকে তথ্য নিয়ে এ সমস্যা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার বলেন তিনি।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ এলাকায় প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০টি ছিনতাই হতো। আইজিপি হিসেবে যোগদানের পর গণমাধ্যমকর্মীসহ আমি এই এলাকা পরিদর্শনে যাই। কম্বিং অপারেশন ও ব্লক রেইড চলছে। তিনি বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে একজন মানুষের শরীরের খণ্ড-বিখণ্ড অংশ উদ্ধার হয়েছে। একজন সুস্থ মানুষের পক্ষে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে মাদকের প্রভাব। মাদকের কারণে সন্তান তার বাবা-মাকে মেরে ফেলছে। তরুণ সমাজকে মাদক থেকে বাঁচাতে হবে।
পুলিশ মহাপরিদর্শক বলেন, অনেক অপরাধের পেছনের কারণ মাদক। পুলিশের কোনো সদস্য যাতে নিজেরা মাদকের সঙ্গে না জড়ান সেদিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
তিনি বলেন, কিশোর গ্যাং যে ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে, এর অন্যতম কারণও মাদক। ধর্ষণসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছেন পুলিশপ্রধান।
পুলিশ সদস্যদের কল্যাণে মনোযোগী হওয়ার কথাও বলেন আলী হোসেন ফকির। উদহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কিছু দিন আগে পা ভাঙা, ক্রাচে ভর করে হাঁটে এমন একজন এসে কান্নাকাটি করে আমাকে জানাল, তাকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি করা হয়েছে। এ ধরনের একজন পাহাড়ে গিয়ে কী করবে? এমন ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকে নজর দেওয়ার কথা বলেন আইজিপি।
আসছে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করার নির্দেশনা দিয়ে পুলিশপ্রধান বলেন, ঈদে যানজট রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যাত্রীদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানো এবং ফিরে আসা নিশ্চিত করতে হবে।





