প্রথম পাতা বাংলাদেশ পানির নিচে বোরো ধান, পথে বসার শঙ্কায় লাখো কৃষক
পানির নিচে বোরো ধান, পথে বসার শঙ্কায় লাখো কৃষক
পানির নিচে বোরো ধান, পথে বসার শঙ্কায় লাখো কৃষক - সংরক্ষিত ছবি।

হাওরের এই সময়টা সাধারণত আনন্দের। দিগন্তজোড়া সোনালি ধান কাটার মৌসুম। কিন্তু এবার সেই সোনালি দৃশ্য নেই। বৃষ্টির পানির তোড়ে বাঁধ ভাঙছে। টানা বৃষ্টিতে পুরোপুরি ডুবে গেছে হাওর। এতে ভেঙে গেছে লাখো কৃষকের স্বপ্ন। ফসলহানিতে হাওরপারের মানুষ এখন দিশেহারা। হাওরে এখন শুধুই হাহাকার। চোখের সামনে তলিয়ে যাচ্ছে সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল। 

ঠান্ডা ঝোড়ো হাওয়া, বজ্রপাত আতঙ্ক, ভারী বৃষ্টি তবুও হাওরের দিকেই দৌড়াচ্ছেন কৃষক। হাঁটু থেকে বুকসমান পানিতে নেমে কেটে আনার চেষ্টা করছেন পরিবারের সারা বছরের খাদ্য জোগানোর ধান। সুনামগঞ্জ, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ হাওরাঞ্চলের প্রায় সব জেলার একই চিত্র।সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে দেখা যায়, মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাপুর গ্রামের কৃষক আলাউদ্দিন মিয়া বুকসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন। তিনি বলেন, অর্ধেক কাটছি, কিন্তু কাটা ধান খলায় পচে যাচ্ছে। বাকি জমি ডুবে গেছে। কী করমু, বুঝতেছি না। একই এলাকার আব্দুস ছাত্তার বলেন, বজ্রপাতের আলোয় চোখ ঝাপসা হয়ে যায়, তবুও কেউ হাওর ছাড়ে না। ধান না তুললে পরিবার চলবে কীভাবে?

দেখার হাওরের আশপাশের অন্তত ১৫টি গ্রামে একই অবস্থা। কোথাও ধান কাটার শেষ চেষ্টা, কোথাও সব ছেড়ে দিয়ে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছেন কৃষক। নলুয়ার হাওরের অবস্থা আরও করুণ। টানা বৃষ্টিতে জেলার আরেক বৃহৎ হাওর নলুয়ার ফসল তলিয়ে গেছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে ফসলের মাঠ জলমগ্ন হলেও রাতের টানা বৃষ্টিতে ফসল তলিয়ে গেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে কৃষকরা পানির নিচে কষ্টার্জিত ফসল দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। নলুয়ার হাওরের দাসনোয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদাচরণ দাস বলেন, আমার সব শেষ হয়ে গেল, একমাত্র বোরো ফসলের ওপর নির্ভরশীল আমার পরিবার। ধারদেনা করে জমি চাষাবাদ করেছিলাম, এখন সারাবছর কীভাবে চলব! তাঁর ধারণা, কমপক্ষে দেড়-দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে।

কাটা ধানও রক্ষা করা যায়নি 
সমস্যা শুধু ডুবে যাওয়া নয়। যে ধান কেটে আনা গেছে, সেটিও রক্ষা করা যাচ্ছে না। রোদ না থাকায় খলায় রাখা ধান পচে যাচ্ছে, অনেক জায়গায় ধানে চারা গজাতে শুরু করেছে। নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার কৃষক আলাল মিয়া ধর্মপাশার ধারাম হাওরে ধান চাষ করেছিলেন। পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আগে তিনি অন্তত ৩০ মণ ধান মাড়াই ঝাড়াই করে সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে সেই ধান শুকাতে পারেননি তিনি। তাই সদর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া গ্রামে নূর ইসলামের দোকানের সামনে ধানগুলো বস্তায় ভরে ফেলে রেখেছেন। কয়েকদিন এভাবে থাকার কারণে ধানে চারা গজিয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করেছে বাঁধের ভাঙন। সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার জামগড়া খালের বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে ইয়ারন বিলের পাকা ধান তলিয়ে গেছে। স্থানীয়রা বলছেন, চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া কিছু করার নেই। 

আবহাওয়া অধিদপ্তর আগেই ভারী বৃষ্টি ও ঢলের সতর্কতা দিয়েছিল। কৃষি বিভাগ পাকা ধান দ্রুত কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। শ্রমিক নেই, যন্ত্র কম, আবহাওয়া অনুকূলে নয়। ফলে অনেক কৃষক চাইলেও সময়মতো ধান তুলতে পারেননি। অনেক জায়গায় শ্রমিক সংকটের কারণে জমির মালিক সন্তানসহ নিজেই ধান কাটছেন। ধর্মপাশার কান্দাপাড়ায় দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুয়াইদ নৌকায় করে ধান টানছে। সে বলল, ‘কামলা নাই, তাই আমরা নিজেরাই ধান কাটছি।’

জেলার পর জেলা বিপর্যস্ত
সুনামগঞ্জে দুই দিনে ৫০৫ হেক্টর জমি ডুবে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কিশোরগঞ্জে প্রায় দুই হাজার হেক্টর ধান তলিয়ে গেছে। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে অন্তত ৪০০ হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে। মৌলভীবাজারে হাজার হাজার হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতি সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি।

বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও এক সপ্তাহ 
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। এরই মধ্যে সমুদ্রবন্দরগুলোতে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। 
আবহাওয়াবিদ শাহীনুল ইসলাম বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলমান বৃষ্টিপাতের প্রবণতা আরও অন্তত এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে। 

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x