প্রথম পাতা বিশ্ব ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকারে নারাজ ইউরোপের নেতারা
ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকারে নারাজ ইউরোপের নেতারা
ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকারে নারাজ ইউরোপের নেতারা - সংরক্ষিত ছবি।

গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে আটটি দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ইউরোপের নেতারা নড়েচড়ে বসেছেন। তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে নতি স্বীকার করতে নারাজ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে দেশগুলোর সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলেও তারা সতর্কতা দিয়েছেন। এ ছাড়া ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে একটি যৌথ বিবৃতি এসেছে ইউরোপীয় নেতাদের কাছ থেকে।

তাতে নেতারা মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে শিগগির সংলাপে বসার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তারা মনে করেন, গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির প্রশ্নে তারা ঐক্যবদ্ধ। গতকাল রোববার ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।

এদিকে ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। মার্কিন শুল্ক নিয়ে সংকটের সমাধান পেতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনীতিকরা জরুরি বৈঠকে বসছেন। 

এ ছাড়া ট্রাম্প এই সপ্তাহের শেষের দিকে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে যোগ দেবেন। এতে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের নেতারাও থাকবেন। এ ছাড়া কানাডা, স্পেন ও বেলজিয়ামের মতো ন্যাটো সদস্যরা এই ফোরামে অংশ নেবেন। এই সম্মেলনে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন পোস্ট লিখেছে, ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ ইউরোপকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ শত্রুতে পরিণত হওয়ার ঘটনায় নেতারা হতবাক হয়ে গেছেন।

গত শনিবার ট্রাম্প ইউরোপের আটটি দেশের বিরুদ্ধে নতুন শুল্ক ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণায় বলেন, গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য চুক্তি করতে হবে, নয়তো শুল্ক দিতে হবে। প্রাথমিকভাবে আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ হবে। পরে জুনে তা বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। শুল্ক আরোপের শিকার আটটি দেশ হলো– ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, বলপ্রয়োগের কৌশল ছাড়া ট্রাম্পকে সহজে হটানো সম্ভব নয়। তবে এটি করলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আরও ভারী মূল্য দিতে হতে পারে। কারণ, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটোকে শক্তিশালী করতে এখনও যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল ইউরোপের দেশগুলো।

লন্ডনের চ্যাথাম হাউস থিঙ্কট্যাঙ্কের পরিচালক ব্রোনওয়েন ম্যাডক্স গতকাল একটি টেক্সট বার্তায় বলেছেন, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে উত্তেজিত না করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ট্রাম্পের পদক্ষেপ তাদের নীতি ও স্বার্থের বিরুদ্ধে এতটাই অপরাধজনক কাজ যে, ইউরোপ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমেও পাল্টা আঘাত হানতে পারে। 

ইইউর শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস শনিবার বলেন, ডেনমার্কের ইচ্ছার বিরুদ্ধে একটি সার্বভৌম অঞ্চল দখলের হুমকি মূলত ন্যাটো প্রতিরক্ষা জোট ভেঙে ফেলার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যা পশ্চিমা বিশ্বকে বিভক্ত করবে। তা ছাড়া ট্রাম্পের এই কর্মকাণ্ড মস্কো ও বেইজিংকে উৎসাহিত করবে।

আট দেশের যৌথ বিবৃতি

ট্রাম্পের শুল্ক হুমকিতে থাকা আট দেশ গতকাল রোববার যৌথ বিৃবতিতে জানিয়েছে, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে তারা ঐক্যবদ্ধ। বিবৃতিতে বলা হয়, আমরা সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার নীতির ওপর ভিত্তি করে সংলাপে অংশ নিতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি ট্রান্সআটলান্টিক (আটলান্টিকের দুই পারের দেশগুলো) সম্পর্ককে দুর্বল করবে এবং খারাপ সম্পর্কের বিপজ্জনক ঝুঁকি তৈরি করবে। 

কোন দেশের কী বক্তব্য

বিবিসি জানায়, ট্রাম্পের শুল্কারোপের বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি সুইডিশ প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন। শনিবার এক্সে এক পোস্টে বলেন, ‘আমরা নিজেদের ট্রাম্পের কাছে ব্ল্যাকমেইল হতে দেব না। অন্যদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, কোনো ভয় বা হুমকি আমাদের প্রভাবিত করতে পারবে না। 

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ তাদের জনগণের বিষয়। ন্যাটো মিত্রদের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মিত্রদের ওপর শুল্ক আরোপ করা সম্পূর্ণ ভুল। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ বলেছেন, শুল্কের হুমকি অগ্রহণযোগ্য। আমরা ভয় বা হুমকিতে নতি স্বীকার করব না। ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে জার্মানি। 

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোকেকে রাসমুসেন বলেন, ট্রাম্পের ঘোষণা আমাকে অবাক করেছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন বলেন, ট্রাম্পের হুমকিকে আমরা ‘সমগ্র ইইউর সমস্যা’ হিসেবেই দেখছি। আমরা ব্ল্যাকমেইলের শিকার হবো না। নেদার‌ল্যান্ডসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ভ্যান উইল বলেন, তাঁর দেশ নতুন শুল্কের বিষয়টি নিয়ে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করবে।

ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার স্টাব ট্রাম্পকে বলেন, সমস্যাগুলো আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়; চাপের মাধ্যমে নয়। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোর বলেন, মিত্রদের হুমকিতে রাখা যায় না। 

ট্রাম্পের যুক্তি 

ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি গ্রিনল্যান্ড দখল না করে, তবে চীন বা রাশিয়া ভূখণ্ডটি দখল করবে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য, মস্কো বা বেইজিংয়ের এ অঞ্চল দখলের পরিকল্পনার কোনো ইঙ্গিত নেই। ওয়াশিংটনের এই অঞ্চলে সৈন্য উপস্থিতি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও কোনো বাধা নেই। 

৫৭ হাজার জনসংখ্যার গ্রিনল্যান্ড শতাব্দী ধরে ডেনমার্ক রাজ্যের অংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক দশকগুলোতে ভূখণ্ডটি আরও স্বায়ত্তশাসন অর্জন করেছে। মতামত জরিপগুলোতে দেখা যায়, গ্রিনল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ওয়াশিংটনের কর্তৃত্বে যাওয়ার বিরোধিতা করে।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x