রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার পর ডাইনিং টেবিলে বসে শসা ও খেজুর খেয়েছেন বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন গ্রেপ্তার দুই যুবক। পরে তারা সঙ্গে থাকা ইয়াবাও সেবন করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এসব তথ্য জানান।
এ ঘটনায় ভোরে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তারা পরস্পরের আত্মীয়। সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে এবং মুগ্ধ একটি মাছের দোকানে কাজ করেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাতে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। বিষয়টি গণপতি দেখে ফেললে ইয়াবা সেবনের কথা প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাঁকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন তারা। পরে গামছা পেঁচিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
গণপতির গোঙানির শব্দ শুনে তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে ওঠার চেষ্টা করলে সিঁড়ির কাছে তাঁকেও গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। মাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থীকেও একইভাবে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর পরিবারের ১২ বছর বয়সী ছেলে এবং রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে ঘুমন্ত অবস্থায় রশি পেঁচিয়ে ও পরে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
হত্যার পরও বাড়িতে অবস্থান
পুলিশ জানায়, চারজনকে হত্যার পরও কিছু সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা প্রথমে গোসল করেন। পরে ডাইনিং টেবিলে বসে শসা ও খেজুর খান এবং সঙ্গে থাকা ইয়াবা সেবন করেন।
ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য বাড়ির আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এলোমেলো করে রাখা হয় বলেও জানিয়েছে পুলিশ। একটি স্বর্ণের চেইন আগুনে পুড়িয়ে সেটি আসল না নকল, তা পরীক্ষা করেন তারা।
পুলিশ আরও জানায়, বাড়িতে থাকা দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট পাউডার মেশানো পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছিল, যাতে সেগুলো থেকে আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা না যায়। পরে শুক্রবার জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তারা।
যেভাবে গ্রেপ্তার
পুলিশের দাবি, ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামতসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে স্থানীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে গ্রেপ্তার করা হয়।
রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানান, এ ঘটনায় কোতয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। গ্রেপ্তার দুজন হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে চার মরদেহ উদ্ধার
শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী এবং ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
কয়েক দিন ধরে বাড়িটি তালাবদ্ধ দেখে স্বজনরা পুলিশকে খবর দেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তালা ভেঙে বাড়িতে প্রবেশ করে পুলিশ।
এ সময় ছাদ থেকে গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ, সিঁড়ির কাছে প্রীতিলতা ও আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ এবং একটি কক্ষের খাটের নিচ থেকে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং আসবাবপত্র তছনছ অবস্থায় ছিল।
গণপতি চক্রবর্তী গত ২ জানুয়ারি রংপুর জিলা স্কুল থেকে অবসর নেন। পরে নগরের সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
রংপুর প্রতিনিধি: 



















