যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর ইরানের পাশে তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর ভূমিকা কী? এই প্রশ্ন গত এক সপ্তাহ ধরে ঘুরেফিরে উচ্চারিত হচ্ছে। রাষ্ট্রগুলো সরাসরি উত্তর না দিলেও গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, ইরানকে যুদ্ধে নানাভাবে সহায়তা করছে চীন-রাশিয়া। তবে উভয় দেশ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
স্বাধীন গণমাধ্যম কাউন্টার কারেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া ও চীন ইরানকে কৌশলগত সহায়তা দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। চীন ইরানের রপ্তানি করা তেলের প্রায় ৯০ শতাংশ কিনছে। স্পেশাল ইউরেশিয়ার মতে, রাশিয়া ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মজবুত করতে উন্নত সু-৩৫ যুদ্ধবিমান ও এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যন্ত্রাংশ সরবরাহ করছে। এ ছাড়া ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়া উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তির সাহায্যে ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনার অবস্থানের তথ্য পাঠিয়েছে। এ সব তথ্যের ভিত্তিতে তারা নিখুঁত হামলা চালাচ্ছে।মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজ বৃহস্পতিবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচির বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রচার করে। সাংবাদিক টম লামাস প্রশ্ন করেন, চীন-রাশিয়ার মতো বন্ধু রাষ্ট্রগুলো কি ইরানকে সহায়তা করছে? এর উত্তরে আরাঘচি বলেন, ‘বন্ধুরা আমাদের রাজনৈতিক এবং অন্যান্যভাবে সহায়তা করছে।’
টম: তারা কি সামরিকভাবে সহায়তা করছে?
আরাঘচি: ‘রাশিয়া-ইরানের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা গোপন কোনো বিষয় নয়। অতীতে যা ঘটেছে, তা আপনারা দেখেছেন, এটা বর্তমানে চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে।’
টম: তারা কি এই যুদ্ধে আপনাদের সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছে?
আরাঘচি: তারা সবসময় আমাদের সহায়তা করে।
টম: আমি স্পষ্ট করে বুঝতে চাচ্ছি, তারা সক্রিয়ভাবে এই যুদ্ধে আপনাদের সহায়তা করছে কিনা।
আরাঘচি: যুদ্ধের মাঝখানে এসে আমি আপনাদের অন্য দেশের সহযোগিতার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলতে চাই না। ইরান সব সময় চীনের মিত্র
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন-ইরান সবসময় বন্ধুসুলভ ছিল। তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ১৯৮৯ সালে শেষবার বিদেশ সফরে বেইজিং গিয়েছিলেন। গ্রেট ওয়ালে তাঁর ছবি তোলা হয়েছিল। ২০১৬ সালে শি জিনপিং তেহরান সফরের পর তাদের অংশীদারিত্ব আরও গভীর হয়। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করে।
চীন ২৫ বছরে ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর বিনিময়ে ইরানের তেল সরবরাহ অব্যাহত রাখার কথা ছিল।
সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি অনুসারে, ২০২৫ সালে চীন ইরান থেকে প্রতিদিন ১৩ দশমিক ৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এটা চীনের মোট আমদানির প্রায় ১২ শতাংশ।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একটি প্রতিবেদন দাবি করেছে, এশিয়ার ভাসমান স্টোরেজে চার কোটি ৬০ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল রয়েছে। এ ছাড়া চীনের ডালিয়ান এবং ঝৌশান বন্দরে আরও তেল জমা আছে। এগুলো কাস্টমস থেকে খালাস করা হয়নি।
চীন ইরানের কাছে অস্ত্র বেচে
এর আগে চীন তেহরানের কাছে অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল বেচার কথা অস্বীকার করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রোগ্রামে সহায়তা করার অভিযোগ এনেছে।
মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বিবিসিকে বলেছে, বিক্ষোভকারীদের ওপর ইরানের কঠোর দমন-পীড়নে বেইজিংয়ের সরবরাহ করা ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
কিছু ট্যাবলয়েড পত্রিকা চীন, ইরান, উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়াকে একত্রে ‘অক্ষ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এই চার দেশই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করতে চায়।
মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে চীন চিন্তিত
ইরানে হামলার পর চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানে হামলা চালানো, এমনকি একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে প্রকাশ্যে হত্যা করা এবং সরকার পরিবর্তনের উস্কানি দেওয়া অগ্রহণযোগ্য।’
জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলা এবং এখন ইরানে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপগুলো চীনের সঙ্গে সেই দেশগুলোর অংশীদারিত্বের সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে। উভয় ক্ষেত্রে বেইজিং প্রকাশ্যে নীরব ভূমিকা পালন করছে।
সোয়াস চায়না ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক স্টিভ সাং বিবিসিকে বলেন, ‘চীনের যুক্তি– ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রমাণ করেছেন, পশ্চিমা বিশ্ব ভণ্ড। তাদের উদার আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কথা নিছক ফাঁপা বুলি।’
ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে রাশিয়া
মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিনজন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার অবস্থান পাঠিয়েছে। একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি বেশ বড় ধরনের প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।’
ওয়াশিংটনে রুশ দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে মস্কো এই যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে একে ‘বিনা উস্কানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছে।
ইরানকে রাশিয়ার দেওয়া এই সহায়তার পরিমাণ স্পষ্ট নয়। কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহের মধ্যে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে ইরানি সেনাবাহিনীর নিজস্ব সক্ষমতা কমে গেছে।
গত রোববার কুয়েতে একটি ইরানি ড্রোন হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত এবং কয়েকজন আহত হন। যৌথ মার্কিন-ইসরায়েলি অভিযানে দুই হাজারের বেশি ইরানি লক্ষ্যবস্তু– যার মধ্যে ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইট, নৌ-সম্পদ এবং দেশটির নেতৃত্ব রয়েছে। আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও ইরান মার্কিন সামরিক অবস্থান, দূতাবাস এবং বেসামরিক এলাকায় হাজার হাজার ড্রোন ও শত শত মিসাইল ছুড়েছে।
রাশিয়ার সহায়তার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘ইরানি শাসন ব্যবস্থা পুরোপুরি বিধ্বস্ত হচ্ছে। তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলার ক্ষমতা প্রতিদিন কমছে, নৌবাহিনী নির্মূল হচ্ছে, উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হচ্ছে এবং তাদের প্রক্সিরা লড়াইয়ে টিকতে পারছে না।’ সিআইএ এবং পেন্টাগন এ নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই সপ্তাহে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেন, তাঁর কাছে তাদের জন্য কোনো বার্তা নেই এবং তারা কোনো ফ্যাক্টর নয়।
রাশিয়ার সমর্থন সম্পর্কে অবগত দুজন কর্মকর্তা জানান, চীন ও ইরানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বেইজিং ইরানকে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে কোনো সহায়তা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাস এ নিয়ে মন্তব্য করেনি। বেইজিংও এই সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার বিষয়টি মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের হামলার ধরনগুলোর সঙ্গে মিলে যায়। এর মধ্যে রয়েছে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল অবকাঠামো, রাডার এবং কুয়েতের মতো অস্থায়ী স্থাপনা। এমনকি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ স্টেশনও সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আক্রান্ত হয়েছে।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের রুশ সামরিক বিশেষজ্ঞ দারা মাসিকোট বলেন, ইরান আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া রাডারগুলোতে নিখুঁতভাবে আঘাত করছে। তারা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু ও কমান্ড সেন্টারগুলো খুঁজছে।
মাসিকোট আরও জানান, ইরানের কাছে হাতেগোনা কিছু সামরিক স্যাটেলাইট আছে। কিন্তু নিজস্ব কোনো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক নেই। এ কারণে রাশিয়ার উন্নত মহাকাশ প্রযুক্তি থেকে পাওয়া ছবি তাদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধে কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকে রাশিয়া এখন লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে অনেক বেশি দক্ষ।
হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টারের গবেষক নিকোল গ্রাজিউস্কি বলেন, ইরানের পাল্টা হামলায় বেশ পরিপক্বতা দেখা গেছে। তারা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করতে পারছে। গত গ্রীষ্মে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের তুলনায় এবার ইরানের হামলার মান উন্নত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রক্সি যুদ্ধের সমীকরণ
ইউক্রেনে রাশিয়ার ২০২২ সালের আক্রমণের পর থেকে দেশগুলো যেভাবে প্রক্সি যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, রাশিয়ার এই সহায়তা সেই সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান, চীন ও উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে সরাসরি বা পরোক্ষ সহায়তা দিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে শত শত কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানি ড্রোন থেকে সুরক্ষায় সহায়তা চেয়েছে। কিয়েভ এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পাঠাবে।
ইউক্রেন যুদ্ধে ইরান রাশিয়ার অন্যতম সমর্থক ছিল। তারা সস্তা ড্রোন তৈরির প্রযুক্তি শেয়ার করেছে, যা কিয়েভের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রাখতে ব্যবহৃত হয়েছে। মস্কোর সমর্থন সম্পর্কে অবগত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ইউক্রেনকে আমাদের দেওয়া সহায়তার বিষয়ে রুশরা ভালোভাবেই জানে। আমার মনে হয়, তারা এখন শোধ নিতে পেরে খুশি।’
রাশিয়া-ইরান অংশীদারিত্ব চুক্তি
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়া ও ইরান বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করে। নিউজ১৮ জানায়, এই চুক্তি প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সমন্বয়কে আরও গভীর করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের মধ্য দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগকারী অবকাঠামো প্রকল্পের পথ প্রশস্ত করেছে। বর্তমানে যে ধরনের সহযোগিতার কথা শোনা যাচ্ছে, এই চুক্তিটি মূলত তারই ভিত্তি স্থাপন করেছে।








