দেশজুড়ে জ্বালানি সংকটের প্রভাব ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায়। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে লোডশেডিং। তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অফিস—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাব পড়ছে।
বিশেষ করে ভাদ্রের গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের বাইরেও বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎনির্ভর দৈনন্দিন কাজগুলো যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইন্টারনেট সেবাতেও।
বর্তমানে পড়াশোনা, অফিসের কাজ, অনলাইন ব্যবসা, ব্যাংকিং, যোগাযোগসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়াইফাই বা ব্রডব্যান্ড সংযোগ বন্ধ হয়ে গেলে ব্যবহারকারীদের পড়তে হচ্ছে নতুন ভোগান্তিতে।
পড়াশোনায় বড় বাধা লোডশেডিং
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন শিক্ষার্থী ও অনলাইনে কাজ করা ব্যক্তিরা। বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার কারণে অনেক সময় কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। আবার বাসার রাউটার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনলাইন ক্লাস, অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় ফাইল পাঠানোর কাজও আটকে যাচ্ছে।
এক শিক্ষার্থী জানান, পড়াশোনা বা অ্যাসাইনমেন্ট করার জন্য বসার পরপরই বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পড়াশোনা শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকের কাছে প্রয়োজনীয় একটি ডকুমেন্ট পাঠানোর জন্য অনলাইনে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বাসার ওয়াইফাই বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ফাইলটি পাঠানো সম্ভব হয়নি।
শুধু শিক্ষার্থী নয়, বাসা থেকে অনলাইনে অফিসের কাজ করা চাকরিজীবী, ফ্রিল্যান্সার এবং ছোট উদ্যোক্তারাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। গুরুত্বপূর্ণ মিটিং, অনলাইন যোগাযোগ কিংবা কাজের ফাইল পাঠানোর সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই কাজের ক্ষতি হচ্ছে।
বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ইন্টারনেট সচল রাখার চেষ্টা
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মধ্যেও গ্রাহকদের ইন্টারনেট সেবা চালু রাখতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করছে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) জানিয়েছে, অনেক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ইউপিএস, ব্যাটারি, জেনারেটর এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সচল রাখার চেষ্টা করছে।
এসব ব্যবস্থার কারণে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পরও অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেটের মূল অবকাঠামো সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে। তবে সমস্যা হচ্ছে, একজন গ্রাহকের বাসা বা প্রতিষ্ঠানে যদি বিদ্যুৎ না থাকে এবং সেখানে রাউটার চালানোর মতো কোনো ব্যাকআপ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে ইন্টারনেট ব্যবহার করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।
অর্থাৎ ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিজেদের নেটওয়ার্ক সচল রাখলেও শেষ প্রান্তের ব্যবহারকারীর কাছে বিদ্যুৎ না থাকলে সংযোগ কার্যত অচল হয়ে পড়ছে।
সংকট দীর্ঘ হলে বাড়তে পারে চাপ
আইএসপিএবির নেতারা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সেবা সচল রাখতে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের সক্ষমতা অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট যদি আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এসব ব্যাকআপ ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়বে।
আইএসপিএবির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রয়োজন হলে জেনারেটরের জ্বালানি মজুত বাড়ানোসহ বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তবে ব্যবহারকারীর নিজস্ব বাসা বা প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ না থাকার সমস্যা ইন্টারনেট সেবাদাতাদের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকের নিজস্ব ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
মোবাইল ইন্টারনেটেও বাড়ছে নির্ভরতা
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় অনেক মানুষ মোবাইল ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করছেন। কিন্তু দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং হলে মোবাইল নেটওয়ার্কের অবকাঠামোর ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
মোবাইল অপারেটরদের টাওয়ারগুলোতে সাধারণত ব্যাটারি বা অন্যান্য ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকে। তবে দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ক্ষেত্রে সেই ব্যাকআপের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত ব্যাকআপ না থাকলে টাওয়ারের কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের সংগঠনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ দ্রুত এই সমস্যা সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তার মতে, বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট কোনো বিলাসী সুবিধা নয়; মানুষের দৈনন্দিন জীবন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও যোগাযোগের সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত।
তিনি মনে করেন, নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে অপারেটরদের টাওয়ারগুলোতে পর্যাপ্ত ব্যাটারি ব্যাকআপ রাখতে হবে। শুধু ব্যাকআপ স্থাপন করলেই হবে না, সেগুলো নিয়মিতভাবে কার্যকর অবস্থায় আছে কি না, সেটিও নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির দাবি
বিশেষজ্ঞ ও ব্যবহারকারীদের মতে, শুধু ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান কিংবা মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে।
বিশেষ করে মোবাইল টাওয়ারগুলোর ব্যাকআপ ব্যবস্থা, জেনারেটর, ব্যাটারি ও অন্যান্য জরুরি অবকাঠামো নিয়মিত পরীক্ষা করা দরকার। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিংয়ের পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক কীভাবে সচল রাখা যায়, সে বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
ডিজিটাল জীবনে বিদ্যুৎ সংকটের বহুমুখী প্রভাব
বর্তমানে ইন্টারনেট ছাড়া একজন শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, একজন চাকরিজীবীর অফিসের কাজ কিংবা একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রেই কঠিন। অনলাইন ক্লাস, ই-মেইল, ভিডিও কনফারেন্স, ডিজিটাল লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সেবা—সবখানেই ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়েছে।
তাই বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক সংকট তৈরি হলেও তার প্রভাব শুধু আলো বা বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, যোগাযোগ এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি ডিজিটাল যোগাযোগ অবকাঠামোকেও জরুরি সেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কের জন্য কার্যকর ব্যাকআপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
desk news 



















