দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নকল ও মানহীন কনডমের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। পরিবার পরিকল্পনা, যৌনরোগ প্রতিরোধ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে কনডম একটি অত্যন্ত কার্যকর ও সহজলভ্য পদ্ধতি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু বাজারে নিম্নমানের ও জাল পণ্যের অনুপ্রবেশ এই নিরাপত্তাব্যবস্থাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার নজরদারিতে দেখা গেছে, অনুমোদনহীন কারখানায় উৎপাদিত এবং মান নিয়ন্ত্রণহীন কনডম পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব পণ্যের মোড়ক অনেক ক্ষেত্রে নামী ব্র্যান্ডের অনুকরণে তৈরি হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে আসল-নকল পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মানহীন কনডম ব্যবহারে ছিদ্র, ফেটে যাওয়া বা স্লিপেজের ঝুঁকি বেশি থাকে। এর ফলে এইচআইভি, সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়াসহ বিভিন্ন যৌনবাহিত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ে। একই সঙ্গে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঘটনাও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দেবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক গবেষক জানান, “কনডমের কার্যকারিতা সম্পূর্ণ নির্ভর করে এর উপাদান, লুব্রিকেশন, পুরুত্ব এবং মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ার ওপর। নকল বা নিম্নমানের পণ্যে এসব মানদণ্ড বজায় থাকে না, ফলে ব্যবহারকারী ভুয়া নিরাপত্তাবোধে ভোগেন।”
বাজার তদারকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অসাধু ব্যবসায়ী চক্র কম দামে নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার করে কনডম তৈরি করছে এবং তা অবৈধ পথে বাজারজাত করছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, ফার্মেসি ও ছোট দোকানগুলোকে টার্গেট করে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে পুনরায় বিক্রির অভিযোগও উঠেছে।
ভোক্তা অধিকার কর্মীরা বলছেন, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কিত পণ্যে নকলের উপস্থিতি শুধু প্রতারণা নয়, এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্য হুমকি। তারা বাজারে নিয়মিত অভিযান, লাইসেন্স যাচাই, উৎপাদন কারখানার মান পরীক্ষা এবং কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, “মানসম্মত কনডম নিশ্চিত করতে আমদানিকারক ও উৎপাদকদের নিবন্ধন, ব্যাচ টেস্টিং এবং নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বাজারে অবৈধ সরবরাহ ঠেকাতে আরও জোরদার নজরদারি প্রয়োজন।”
বিশেষজ্ঞরা ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। কনডম কেনার সময় অনুমোদিত ব্র্যান্ড, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, মোড়কের সিল এবং সরকারি অনুমোদনের চিহ্ন যাচাই করার আহ্বান জানানো হয়েছে। সন্দেহজনক কমদামি পণ্য এড়িয়ে চলতেও বলা হয়েছে।
এদিকে বিভিন্ন এনজিও ও স্বাস্থ্যসংস্থা যৌনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানসম্মত পণ্য ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে প্রচারণা জোরদার করেছে। তারা বলছে, নিরাপদ যৌনাচার নিশ্চিত করতে শুধু সচেতনতা নয়, নিরাপদ পণ্যের প্রাপ্যতাও সমান জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের মতে, নকল ও মানহীন কনডমের বিস্তার রোধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত সরবরাহ চেইন পর্যবেক্ষণ, ভোক্তা শিক্ষা এবং আইন প্রয়োগ একসঙ্গে কার্যকর হলে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, কনডমের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসুরক্ষা পণ্যে নকলের অনুপ্রবেশ শুধু বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতাই নয়, এটি জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে









