প্রথম পাতা বিনোদন আমদানি বেড়েছে ১১%, তবু বাজারে খেজুরের বাড়তি দাম
আমদানি বেড়েছে ১১%, তবু বাজারে খেজুরের বাড়তি দাম
আমদানি বেড়েছে ১১%, তবু বাজারে খেজুরের বাড়তি দাম - সংরক্ষিত ছবি।

রোজার বাজারে খেজুরের গুরুত্ব আলাদা। ফলে খেজুরের দামের ওঠানামা সরাসরি প্রভাব ফেলে রোজার পণ্য কেনাকাটায়। পণ্যটির দাম বাড়লে খরচও বেড়ে যায়। এবার রোজা সামনে রেখে খেজুরের আমদানি বেড়েছে। দাম যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে, সে জন্য আমদানি শুল্কও কমানো রয়েছে। বন্দর দিয়ে আমদানি করা খেজুর নিয়মিত খালাসও হচ্ছে। তবু খুচরা বাজারে পাঁচ ধরনের খেজুরের দাম গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেশি।

বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকে জাহিদি খেজুর। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের কাছে এই খেজুর বেশি পছন্দের। এ জন্য অনেকেই এটিকে ‘গরিবের খেজুর’ হিসেবেও অভিহিত করেন। দেশে জাহিদি খেজুর আমদানিও হয় সবচেয়ে বেশি। এবার রোজা শুরুর আগেই জাহিদি খেজুরের দাম কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। শুধু জাহিদি নয়, দাব্বাস, নাকাল, মাশরুখ ও আম্বর—এই পাঁচ ধরনের খেজুরের দাম বেড়েছে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত।

জাহিদি খেজুর মূলত ইরাক থেকে দুবাই হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে। সেখান থেকে পাইকারি বাজারে ছড়িয়ে পড়ে। কার্টন ও বস্তা—দুইভাবে বিক্রি হয় এই খেজুর। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে (কার্টন হিসাবে বিক্রি হওয়া) প্রতি কেজি জাহিদি খেজুর বিক্রি হয়েছে ২৮০ টাকায়, আর খুচরায় দাম ছিল ৩৫০ টাকা। গত বছর রোজার শুরুতে খুচরায় প্রতি কেজি জাহিদি খেজুরের দাম ছিল ২০০ টাকা। এ ছাড়া পাইকারি বস্তা হিসাবে বিক্রি হওয়া প্রতি কেজি জাহিদি খেজুরের দাম ছিল ১৯০ টাকা, খুচরায় তা ২৫০ থেকে ২৮০ টাকা বিক্রি হয়। গত বছর খুচরায় এ খেজুরের দাম ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা।বাজার ঘুরে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এবার দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ড থেকে আসা একটি জাহাজে থাকা প্রায় ৪ হাজার টন খেজুর সাগরে ডুবে গেছে। এ কারণে বড় চালান বাজারে আসেনি। ডুবে যাওয়া ওই খেজুরের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল জাহিদি। এ ছাড়া বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ইজারার প্রতিবাদে কর্মবিরতি পালন করেন বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাতে কয়েক দিন পণ্য খালাস বন্ধ ছিল। তারও প্রভাব পড়েছে সরবরাহ ব্যবস্থায়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, সরবরাহে সাময়িক ঘাটতির কারণেই জাহিদি খেজুরের দাম বেড়েছে। বন্দর এখন স্বাভাবিক, নতুন চালান আসছে। তাঁর দাবি, এক সপ্তাহের মধ্যে দাম কমে যাবে।

আমদানি বেড়েছে ১১%

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ১ নভেম্বর থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খেজুর আমদানি হয়েছে ৪৯ হাজার ৮০৭ টন। গত বছর একই সময়ে আমদানি হয়েছিল ৪৪ হাজার ৭১৬ টন। অর্থাৎ আমদানি বেড়েছে ৫ হাজার ৯১ টন বা ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।

দায়িত্ব ছাড়ার আগে অন্তর্বর্তী সরকার খেজুর আমদানিতে শুল্ক কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। রমজান মাসে খেজুরের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্বাভাবিক রাখার উদ্দেশ্যে গত ২৪ ডিসেম্বর খেজুরের আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। পাশাপাশি আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম আয়কর ১০ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে, যা ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর। এর আগে ২০২৪ সালেও শুল্ক ২৫ থেকে ১৫ শতাংশে নামানো হয়েছিল। তখন আমদানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দামও তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল।

ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, রোজায় খেজুরের মোট চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার টন। বর্তমান আমদানির গতি বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে সরবরাহ চাহিদা ছাড়িয়ে যাবে। শুধু ১৫ থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি—তিন দিনেই চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে খালাস হয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ টন খেজুর। এনবিআরের হিসাবে, চলতি মৌসুমে আমদানি করা খেজুরের প্রায় ৩০ শতাংশই জাহিদি, যার পরিমাণ প্রায় ১৫ হাজার টন।

খেজুর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান আল্লাহর রহমত স্টোরের কর্ণধার মো. কামাল প্রথম আলোকে বলেন, জাহাজ ডুবে যাওয়ার কারণে বিপুল পরিমাণ জাহিদি খেজুর বাজারে ঢুকতে পারেনি। ব্যবসায়ীরা তাৎক্ষণিক বিকল্প উৎস থেকে জাহিদি সংগ্রহ করেছেন, যা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে চলে আসবে। তখন দামও কমে যাবে।

খাতুনগঞ্জের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, শুল্ক-কর কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালার নমনীয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত খেজুর আমদানি করতে পারছেন। তাই সরবরাহে ঘাটতি শিগগিরই কেটে যাবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রোজায় খেজুরের চাহিদা দ্রুত বাড়ে। সরবরাহে সামান্য বিলম্ব হলেই তার প্রভাব পড়ে বাজারে। পাইকারি পর্যায়ে সামান্য মূল্যবৃদ্ধি খুচরায় এসে আরও বেড়ে যায়। তাই আমদানি ব্যয় কমলেও সেই সুবিধা ভোক্তারা পান না। বাজারে তদারকি কম থাকাকেও মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে অভিহিত করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দাম কত বাড়ল

মান ও জাত ভেদে একেক খেজুরের একেক দাম। চট্টগ্রামের স্টেশন রোডের ফলমন্ডিতে নাকাল জাতের প্রতি কেজি খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৩৬০ টাকায়, গত বছর দাম ছিল ২৮০। মাশরুখ জাতের খেজুর বিক্রি হচ্ছে ৪৫০ টাকায়, গত বছর এই খেজুরের দাম ছিল ৪০০ টাকা। একই বাজারে আম্বর এবার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, গত বছর দাম ছিল ৬০০ টাকা। দাব্বাস এবার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, গত বছর দাম ছিল ৪০০ টাকা। তবে আজোয়া, মেডজুল ও মরিয়মের মতো খেজুরের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে এবার।

রিয়াজউদ্দিন বাজার থেকে আইয়ুবুর রহমান পাঁচ কেজি কার্টনের জাহিদি খেজুর কিনেছেন ১ হাজার ৭৫০ টাকায়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রোজায় প্রতিদিনই খেজুর লাগে। দাম বাড়লেও কিনতেই হয়।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফ্রেশ ফ্রুটস অ্যান্ড ডেটসের কর্ণধার মো. শফিউল আজম বলেন, পাইকারিতে বেশির ভাগ খেজুরের দাম স্থিতিশীল। তবে জাহিদি ও দাব্বাস জাতের খেজুরের দাম কিছুটা বাড়তি।

এদিকে গত মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে খেজুর বিক্রি শুরু করেছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি । তারা ১৬০ টাকা কেজি দরে খেজুর বিক্রি করছে। একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ আধা কেজি খেজুর কিনতে পারছেন।

বাড়তি আমদানির পরও খেজুরের দাম বাড়ার পেছনে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সজীব কুমার ঘোষ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, খেজুর এখন আর কেবল রোজাভিত্তিক পণ্য নয়; সারা বছরই এর একটি স্থিতিশীল চাহিদা রয়েছে। তবে রোজা এলেই এই চাহিদা দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়। বাজারে এমন মৌসুমি চাপ সামাল দিতে হলে সরবরাহও ঠিকঠাক না থাকলে সামান্য ঘাটতিও তখন মূল্যবৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x