Dhaka ০৪:৪৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বঙ্গবীর ওসমানী: মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

  • Desk News
  • Update Time : ০১:২৩:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৯ Time View

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেসব বীরের নাম চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী—সংক্ষেপে এম এ জি ওসমানী—তাদের অন্যতম। বাঙালির কাছে তিনি পরিচিত ‘বঙ্গবীর’ নামে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ ১ সেপ্টেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১৮ সালের এই দিনে তিনি সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর

এম এ জি ওসমানী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একজন মানুষ। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি তাঁর মেধার পরিচয় দেন। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সামরিক পেশায় যোগ দেন। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের সূচনা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও দায়িত্ব পালন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। বার্মা রণাঙ্গনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর সামরিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনে তিনি জেনারেল স্টাফ ও সামরিক পরিচালনাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি কৌশল, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নেতৃত্বের প্রয়োজন

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের পর পরিস্থিতি দ্রুত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

আরও পড়ুনঃ  সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাবের জীবন সদস্য হলেন কয়েস লোদী

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিকামী মানুষ প্রতিরোধে অংশ নিলেও তখন প্রয়োজন ছিল একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। মুক্তিযুদ্ধকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ, যুদ্ধের পরিকল্পনা, সেক্টরভিত্তিক সমন্বয় এবং গেরিলা অভিযান পরিচালনার একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা।

এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই কাঁধে তুলে নেন এম এ জি ওসমানী।

মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ওসমানী

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সামরিক নেতৃত্ব ও কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো ধীরে ধীরে সুসংগঠিত রূপ পেতে শুরু করে।

যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এসব সেক্টর ও সাব-সেক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং অভিযান সমন্বয় করা হয়।

গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে গুরুত্ব

পাকিস্তানি বাহিনী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধ চালিয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা মুক্তিবাহিনীর জন্য কঠিন ছিল। এই বাস্তবতা ওসমানী উপলব্ধি করেছিলেন।

তাই মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা কৌশলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, সরবরাহ লাইন এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অতর্কিত হামলা চালাতেন। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে।

নৌ ও বিমান সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ

মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু স্থলপথে নয়, নদীপথ ও আকাশপথেও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দেয়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন এবং সীমিত বিমান সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই আপন আত্মীয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

নৌ-কমান্ডোরা নদীবন্দর ও পাকিস্তানি বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ আঘাত হানেন। অন্যদিকে সীমিত বিমান সক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

এসব উদ্যোগের ফলে মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি সংগঠিত সামরিক সংগ্রামে পরিণত হয়।

বিজয়ের পথে মুক্তিবাহিনী

১৯৭১ সালের শেষ দিকে মুক্তিযুদ্ধ নতুন গতি পায়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাবাহিক প্রতিরোধ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তাদের সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

ডিসেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক অংশগ্রহণ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

এরপর বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী একের পর এক প্রতিরোধ হারাতে থাকে। ঢাকার চারপাশে তাদের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—১৬ ডিসেম্বর। এদিন ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না ওসমানী

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে এম এ জি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি এবং বিজয়ী যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

আত্মসমর্পণের দলিলে অরোরাকে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধে ওসমানীর ভূমিকার গুরুত্বকে কোনোভাবেই কমিয়ে দেয় না। পুরো নয় মাসের যুদ্ধজুড়ে মুক্তিবাহিনীর সামরিক সংগঠন, যুদ্ধ পরিচালনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ  ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ, টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত অর্ধশত

স্বাধীনতার পরও স্মরণীয় হয়ে আছেন

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে এম এ জি ওসমানীর নাম বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর নেতৃত্ব, সামরিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে এম এ জি ওসমানীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই বীর সেনানায়ককে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।

মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানায়ক বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল ‘বঙ্গবীর’ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

বঙ্গবীর ওসমানী: মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতির ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ

Update Time : ০১:২৩:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যেসব বীরের নাম চিরকাল গভীর শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে, জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী—সংক্ষেপে এম এ জি ওসমানী—তাদের অন্যতম। বাঙালির কাছে তিনি পরিচিত ‘বঙ্গবীর’ নামে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধকে একটি সুসংগঠিত সামরিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আজ ১ সেপ্টেম্বর, মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর প্রধান সেনাপতি জেনারেল এম এ জি ওসমানীর ১০৮তম জন্মবার্ষিকী। ১৯১৮ সালের এই দিনে তিনি সুনামগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। দেশের স্বাধীনতার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসে তাঁর অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

শৈশব থেকেই মেধার স্বাক্ষর

এম এ জি ওসমানী ছিলেন অসাধারণ মেধাবী ও শৃঙ্খলাবদ্ধ একজন মানুষ। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই তিনি তাঁর মেধার পরিচয় দেন। ১৯৩৪ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় তিনি সমগ্র ব্রিটিশ ভারতে প্রথম স্থান অর্জন করেন। পরবর্তীতে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।

শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি সামরিক পেশায় যোগ দেন। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগদানের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য সামরিক জীবনের সূচনা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও দায়িত্ব পালন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওসমানী গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। বার্মা রণাঙ্গনেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা তাঁর সামরিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে আরও সমৃদ্ধ করে।

ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সামরিক জীবনে তিনি জেনারেল স্টাফ ও সামরিক পরিচালনাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ সামরিক জীবনে তিনি কৌশল, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন।

১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে নেতৃত্বের প্রয়োজন

১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করলে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে। ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের পর পরিস্থিতি দ্রুত সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়।

আরও পড়ুনঃ  ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ, টর্চলাইট জ্বালিয়ে সংঘর্ষে পুলিশসহ আহত অর্ধশত

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুক্তিকামী মানুষ প্রতিরোধে অংশ নিলেও তখন প্রয়োজন ছিল একটি সুসংগঠিত সামরিক কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের। মুক্তিযুদ্ধকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ, যুদ্ধের পরিকল্পনা, সেক্টরভিত্তিক সমন্বয় এবং গেরিলা অভিযান পরিচালনার একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা।

এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বই কাঁধে তুলে নেন এম এ জি ওসমানী।

মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ওসমানী

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় সামরিক নেতৃত্ব ও কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরবর্তীতে মুজিবনগর সরকার এম এ জি ওসমানীকে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কাঠামো ধীরে ধীরে সুসংগঠিত রূপ পেতে শুরু করে।

যুদ্ধ পরিচালনার সুবিধার্থে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। এসব সেক্টর ও সাব-সেক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ পরিচালনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ এবং অভিযান সমন্বয় করা হয়।

গেরিলা যুদ্ধের কৌশলে গুরুত্ব

পাকিস্তানি বাহিনী ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত। তাদের সঙ্গে সরাসরি প্রচলিত যুদ্ধ চালিয়ে দীর্ঘ সময় টিকে থাকা মুক্তিবাহিনীর জন্য কঠিন ছিল। এই বাস্তবতা ওসমানী উপলব্ধি করেছিলেন।

তাই মুক্তিযুদ্ধে গেরিলা কৌশলকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, সরবরাহ লাইন এবং গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

মুক্তিযোদ্ধারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে অতর্কিত হামলা চালাতেন। এতে পাকিস্তানি বাহিনীর চলাচল ও সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে।

নৌ ও বিমান সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ

মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু স্থলপথে নয়, নদীপথ ও আকাশপথেও পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার প্রয়োজন দেখা দেয়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠন এবং সীমিত বিমান সক্ষমতা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।

আরও পড়ুনঃ  নানি-নাতির বাংলাদেশ জয়ের গল্প

নৌ-কমান্ডোরা নদীবন্দর ও পাকিস্তানি বাহিনীর সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ আঘাত হানেন। অন্যদিকে সীমিত বিমান সক্ষমতা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

এসব উদ্যোগের ফলে মুক্তিযুদ্ধ শুধু বিচ্ছিন্ন প্রতিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি সংগঠিত সামরিক সংগ্রামে পরিণত হয়।

বিজয়ের পথে মুক্তিবাহিনী

১৯৭১ সালের শেষ দিকে মুক্তিযুদ্ধ নতুন গতি পায়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাবাহিক প্রতিরোধ এবং পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তাদের সামরিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

ডিসেম্বরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও দ্রুত পরিবর্তিত হয়। ৩ ডিসেম্বর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সামরিক অংশগ্রহণ প্রকাশ্য রূপ নেয়।

এরপর বাংলাদেশ ও ভারতীয় বাহিনী যৌথভাবে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে। পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনী একের পর এক প্রতিরোধ হারাতে থাকে। ঢাকার চারপাশে তাদের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন—১৬ ডিসেম্বর। এদিন ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় এবং বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না ওসমানী

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে এম এ জি ওসমানী উপস্থিত ছিলেন না। ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এ এ কে নিয়াজি এবং বিজয়ী যৌথ বাহিনীর পক্ষে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

আত্মসমর্পণের দলিলে অরোরাকে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় যৌথ কমান্ডের প্রধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

তবে অনুষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধে ওসমানীর ভূমিকার গুরুত্বকে কোনোভাবেই কমিয়ে দেয় না। পুরো নয় মাসের যুদ্ধজুড়ে মুক্তিবাহিনীর সামরিক সংগঠন, যুদ্ধ পরিচালনা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়ুনঃ  আজ ফ্যামিলি কার্ড পাচ্ছেন সিলেট বিভাগের ৬৯৭ নারী

স্বাধীনতার পরও স্মরণীয় হয়ে আছেন

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে এম এ জি ওসমানীর নাম বাংলাদেশের সামরিক ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। তাঁর নেতৃত্ব, সামরিক প্রজ্ঞা ও সাংগঠনিক দক্ষতা মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে এম এ জি ওসমানীর ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

আজ তাঁর জন্মবার্ষিকীতে জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছে এই বীর সেনানায়ককে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা আমাদের দায়িত্ব।

মহান মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানায়ক বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরকাল ‘বঙ্গবীর’ হিসেবে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।