
ক্যানসারে আক্রান্ত অসুস্থ বাবাকে হাসপাতালে রেখে এসএসসি পরীক্ষায় বসেছিল যশোরের চৌগাছার হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ঋতু খাতুন। পরীক্ষার দিনই বাবাকে হারিয়েও থেমে থাকেনি তার পথচলা। বুকভরা শোক আর দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে একের পর এক পরীক্ষা শেষ করে শেষ পর্যন্ত অর্জন করেছে জিপিএ-৫।
ঋতু চৌগাছা শহরের ছারা পাইলট বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে এসএসসি পরীক্ষা দিতে পৌঁছানোর পর গত ১০ মে ভোরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তার বাবা কবির হোসেন।
পরীক্ষা শেষে ঋতু যখন বাড়ি ফিরে, ততক্ষণে বাবার মরদেহ উঠানে। জীবনের সবচেয়ে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হয় সে—বাবা আর নেই। শেষবারের মতো বাবার মুখ দেখে অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানিয়েই তাকে আবার বসতে হয়েছে পরবর্তী পরীক্ষার প্রস্তুতিতে।
বুকফাটা শোক, পিতৃহারা যন্ত্রণা আর অসীম দারিদ্র্যকে সঙ্গী করেই একের পর এক পরীক্ষা শেষ করে ঋতু। অবশেষে ১০ আগস্ট এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা যায়, সব প্রতিকূলতা জয় করে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে।
যেখানে মানবিক বিভাগে ফলাফল নিয়ে নানা আলোচনা চলছে, সেখানে ঋতুর এই সাফল্য শিক্ষক, পরিবার ও এলাকাবাসীকে অভিভূত করেছে।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের মৃত কবির হোসেন ও রেহেনা খাতুন দম্পতির দুই মেয়ের মধ্যে ছোট ঋতু। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ঋতুর জিপিএ-৫ পাওয়ার খবরে পরিবার ও শিক্ষকদের মাঝে আনন্দের পাশাপাশি নেমে এসেছে আবেগের ছায়া।
ফলাফলের প্রতিক্রিয়ায় অশ্রুসজল ঋতু বলে, ‘বাবা আজ বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন।’
তবে জিপিএ-৫ পাওয়ার আনন্দের পরপরই সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অনিশ্চয়তা। দিনমজুর বাবা মারা যাওয়ায় পরিবারটিতে এখন আয়ের কোনো ব্যক্তি নেই। ফলে ঋতুর উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে চলবে, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে পরিবার।
হাকিমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র সহকারী শিক্ষক শাহানা খাতুন বলেন, ‘ঋতু খুবই মেধাবী। শিক্ষকরা তার কাছ থেকে ভালো ফলের প্রত্যাশা করতেন। অসুস্থ বাবা ও চরম দারিদ্র্য তার ফলাফলে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। সমাজে কোনো শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা বা বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার উচ্চশিক্ষার পথ সহজ হবে।’
ঋতুর এই অসামান্য সাফল্যে আনন্দ প্রকাশ করেছেন চৌগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম। তিনি জানান, উপজেলা প্রশাসন এই অদম্য মেধাবীর পাশে থাকবে এবং তার উচ্চশিক্ষায় সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে।
বাবাকে হারানোর শোক বুকে চেপে পরীক্ষার হলে বসে জিপিএ-৫ অর্জন করা ঋতুর গল্প যেন প্রমাণ করে—প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে তা হার মানতে বাধ্য।
যশোর প্রতিনিধি 

























