
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) আনুষ্ঠানিক যাত্রার শুরুতেই এর প্রস্তাবিত অধিক্ষেত্র নিয়ে আপত্তি তুলেছেন সিলেটের দুই সংসদ সদস্য। প্রস্তাবিত প্রায় ৯৯৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ উপজেলাকে আপাতত সিউকের আওতায় না রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
সংসদ সদস্যদের মতে, শুরুতেই পুরো উপজেলা অন্তর্ভুক্ত না করে সিউকের সেবা ও পরিকল্পনার পরিধি ধাপে ধাপে বাড়ানো যেতে পারে। তবে সিউক চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর দাবি, অধিক্ষেত্র নিয়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। চার উপজেলা পুরোপুরি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় নেওয়ার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সিলেট জেলা পরিষদ মিলনায়তনে সিউকের কার্যক্রম ও অস্থায়ী কার্যালয় উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সুধী সমাবেশে এ নিয়ে মতবিরোধের বিষয়টি সামনে আসে।
অনুষ্ঠানে সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, সিউকের প্রস্তাবিত অধিক্ষেত্রে গোলাপগঞ্জকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগের দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে ফোন করে বিষয়টি তাকে জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, শুরুতে অন্তত সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকাকে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় রাখা যেতে পারে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী আশপাশের এলাকাগুলো পর্যায়ক্রমে যুক্ত করার ব্যবস্থা করা হোক।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যে কর আদায় করে, সেই অর্থ সংশ্লিষ্ট এলাকার উন্নয়নে ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এমরান আহমদ বলেন, ‘সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আওতায় গোলাপগঞ্জসহ আশপাশের উপজেলাগুলোকে আপাতত অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য আমি মাননীয় পূর্তমন্ত্রীর কাছে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।’
একই অনুষ্ঠানে সিলেট-২ আসনের সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা বিশ্বনাথকে সিউকের পরিকল্পনার বাইরে রাখার অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, নগর পরিকল্পনার আওতায় চারটি শহর ও চারটি উপজেলা অন্তর্ভুক্ত করে যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, সেখানে বিশ্বনাথও রয়েছে। কিন্তু সিলেট শহর থেকে বিশ্বনাথের দূরত্বের কারণে সাধারণ মানুষের জন্য নগরে এসে সেবা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, ‘সেখানকার সাধারণ মানুষের পক্ষে নগরে এসে সেবা গ্রহণ করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে। তাই বিশ্বনাথকে এই পরিকল্পনার আওতার বাইরে রাখার জন্য আমি মাননীয় মন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
সিউকের নথি অনুযায়ী, বর্তমানে সিলেট মহানগরের আয়তন ৭৯ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার। এর সঙ্গে সিলেট সদর, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথ—এই চার উপজেলা যুক্ত করে প্রায় ৯৯৫ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে সিউকের অধিক্ষেত্র করার প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে এই প্রস্তাব এখনো চূড়ান্ত নয় বলে জানিয়েছেন সিউক চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। মুঠোফোনে তিনি বলেন, ‘আমরা চারটি উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি, এটি কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা আসেনি। তবে এমপি যদি আপত্তি জানিয়ে থাকেন, তাহলে অবশ্যই সেটি মূল্যায়ন করা হবে।’
সংসদ সদস্যরা বিষয়টি ভুল বুঝেছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘তারা ভাবছেন আমরা পুরো উপজেলা নিয়ে নেব, কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। সিটি ও সদর উপজেলার পাশাপাশি অধিকরণ জায়গা হিসেবে বিশ্বনাথ, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জের কিছু অংশ আসে, সেই হিসেবে আমরা এই প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। তাও সেটা চূড়ান্ত নয়।’
এদিকে অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের আপত্তির বিষয়টি কিছুটা রসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি নিজের তিন বছর বয়সী নাতনির উদাহরণ দিয়ে সিউকের সঙ্গে বিষয়টির তুলনা করেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মোটামুটি সব কথাই বলা হয়ে গেছে। তবে একটা মজার বিষয় দেখলাম। আমার একটি নাতনি আছে, বয়স তিন বছর এখনো বড় হয়নি। এর মধ্যেই তার বাবা-মা তাকে স্কুলে পাঠায়। সেখানে কী শেখে, আল্লাহই জানেন।’
নাতনির আচরণের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনি পাশে থেকে কথা বললে হয়তো একটু পরে লজ্জা ভেঙে উত্তর দেবে। কিন্তু বেশি কাছে যেতে বা বেশি মাখামাখি করতে গেলে সেটা আবার পছন্দ করে না। সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে দেখে আমার সেই কথাটাই মনে পড়ল। সবাই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশংসা করছেন। আবার মাননীয় সংসদ সদস্যরা বলছেন, একটু দূরে থাকো।’
তিনি আরও বলেন, ‘সংস্থাটি তেমন ভয়াবহ কিছু নয়। কাজ শুরু করলে হয়তো সবাই পছন্দ করবেন।’
সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৩-এর আওতায় গঠিত সিউকের লক্ষ্য সিলেটকে পরিকল্পিত, সমন্বিত ও আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলা। ভূমির যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নিম্নবিত্ত ও বস্তিবাসীদের আবাসন সমস্যার সমাধানে কাজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কর্তৃপক্ষকে।
এর পাশাপাশি বনায়ন, পরিবেশদূষণ রোধ, উড়ালসেতু নির্মাণ ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাসহ নগর উন্নয়নের বিভিন্ন বিষয়ও সিউকের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে।
কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাজস্ব খাতে ৬৭টি ক্যাটাগরিতে মোট ৭১৪টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাবও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তবে সিউকের অধিক্ষেত্র শেষ পর্যন্ত কতটুকু হবে, বিশেষ করে গোলাপগঞ্জ ও বিশ্বনাথের অবস্থান কী হবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়। সংসদ সদস্যদের আপত্তি ও সংশ্লিষ্টদের মতামত মূল্যায়নের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সিলেট প্রতিনিধি 



















