Dhaka ০৬:৩৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা ও পোড়ানো চুড়ির সূত্রে শিক্ষক পরিবারের চার হত্যার রহস্য উদঘাটন এনসিপির জরুরি সংবাদ সম্মেলন সোমবার যুদ্ধের মধ্যেই জ্বালানি নিয়ে বড় সুখবর দিল ইরান মাদ্রাসাছাত্রীকে ধ র্ষ ণের দায়ে দুজনের যাবজ্জীবন ইসলামি বক্তা মিসবাহের ‘১০ নম্বর স্ত্রী’ হতে চান কনটেন্ট ক্রিয়েটর মীম সিলেটে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় ৭৩ আসামি গ্রেপ্তার রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব হলেন আবু আউয়াল সিলেটের মেয়ে রুবাইয়ার  ৭৩ লাখ ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ অর্জন শাহজালাল বিমানবন্দরে ৩ কেজি কুশসহ ভারতীয় নাগরিক গ্রেপ্তার এয়ার হোস্টেস থেকে পুলিশ কর্মকর্তা, এবার কোটি টাকার জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগে বরখাস্ত

সিলেটের ট্রিপল মার্ডার: কোটি টাকার জমি নিয়ে কার সঙ্গে বিরোধ ছিল আব্দুস সাত্তারের?

সিলেট নগরীর রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে বাসার দ্বিতীয় তলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে সামনে এসেছে একাধিক তথ্য। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে বুধবার সকালে ওই বাসায় যায় বাবুল। পরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের জেরে প্রথমে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর একে একে সুরাইয়া বেগম ও আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।

অন্যদিকে, নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থলের মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া যায়। এছাড়া রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ ছিল। ওই মামলার শুনানির তারিখও হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহ পর, আগামী ১৯ আগস্ট নির্ধারিত ছিল।

### কার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল?

আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিকের তথ্য অনুযায়ী, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন ও লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা এবং সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে ওই এলাকায় বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার। পরে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ২০২৩ সালে তিনি আদালতে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩।

পরবর্তীতে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল আগামী ১৯ আগস্ট।

আরও পড়ুনঃ  ডোপ টেস্টে ইতিবাচক ফল, অভিযুক্তের ৫ মাসের জেল সহ জরিমানা

অর্থাৎ, আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সিরাজুল ইসলামের নাম মামলার নথিতে রয়েছে। তবে এই বিরোধের সঙ্গে তিনজনের হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক বলেন, আব্দুস সাত্তার মামলার প্রতিটি শুনানিতে আদালতে হাজিরা দিতেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন।

### সম্পত্তির কাগজপত্র নিয়ে রহস্য

হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মেঝেতে একটি দলিলের কপি পাওয়ার কথাও জানিয়েছে নিহতের পরিবার।

এ কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

তাঁর ধারণা, আব্দুস সাত্তারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ বিষয়ে এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া হয়নি। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সব দিক বিবেচনা করেই তদন্ত চলছে।

### পুলিশের তদন্তে প্রেমের সম্পর্কের তথ্য

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। বাবুল পেশায় রংমিস্ত্রির কাজ করত। পাশাপাশি মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছে, ওই বাড়িতে কাজ করার সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় যায়। তাহমিনা তাকে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করান। এরপর দরজা বন্ধ করে দুজন একটি কক্ষে যান।

সেখানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়। তখন বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাহমিনার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  শেখ হাসিনা দেশে আসলেই তাকে গ্রেফতার করা হবে: আইনমন্ত্রী

### একে একে তিনজনকে হত্যা

পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, তাহমিনার চিৎকার ও শব্দ শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে আসেন। তখন বাবুল তাঁকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে।

সুরাইয়া বেগমকে আঘাত করার পর তাঁদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।

পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী দুজনকেই হত্যা করে বাবুল। পরে সে বাসার বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে।

### কে ছিলেন আব্দুস সাত্তার?

নিহত আব্দুস সাত্তার ছিলেন সিলেটের পরিচিত ব্যবসায়ী। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনা থাকতেন।

আব্দুস সাত্তারের এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।

### হত্যার কারণ নিয়ে এখনো প্রশ্ন

একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু এবং বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, ওই সম্পর্কের জেরেই প্রথমে তাহমিনাকে হত্যা করা হয় এবং পরে গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে যায় বাবুল।

অন্যদিকে, আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি নিয়ে চলমান মামলা, মামলার নথি, খোয়া যাওয়া কাগজপত্র এবং হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহ পর নির্ধারিত আদালতের শুনানির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে **সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধ থাকলেও ওই বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।** একইভাবে পুলিশের পক্ষ থেকেও সম্পত্তি বিরোধকে হত্যার কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে ডিবি পরিচয়ে অপহরণের চেষ্টা,গাড়িসহ যুবক আটক

ফলে সিলেটের বহুল আলোচিত এই ট্রিপল মার্ডারের পেছনে আসল কারণ কী—তা জানতে পুলিশি তদন্ত ও পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের দিকেই এখন নজর সবার।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা ও পোড়ানো চুড়ির সূত্রে শিক্ষক পরিবারের চার হত্যার রহস্য উদঘাটন

সিলেটের ট্রিপল মার্ডার: কোটি টাকার জমি নিয়ে কার সঙ্গে বিরোধ ছিল আব্দুস সাত্তারের?

Update Time : ১১:৫২:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

সিলেট নগরীর রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় ব্যবসায়ী ও সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে বাসার দ্বিতীয় তলায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

তবে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ নিয়ে সামনে এসেছে একাধিক তথ্য। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে বুধবার সকালে ওই বাসায় যায় বাবুল। পরে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে দুজনের মধ্যে বিরোধের জেরে প্রথমে তাহমিনাকে ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর একে একে সুরাইয়া বেগম ও আব্দুস সাত্তারকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।

অন্যদিকে, নিহত আব্দুস সাত্তারের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থলের মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া যায়। এছাড়া রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের দীর্ঘদিনের আইনি বিরোধ ছিল। ওই মামলার শুনানির তারিখও হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহ পর, আগামী ১৯ আগস্ট নির্ধারিত ছিল।

### কার সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ ছিল?

আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিকের তথ্য অনুযায়ী, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন ও লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা এবং সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়।

গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে ওই এলাকায় বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার। পরে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে ২০২৩ সালে তিনি আদালতে স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩।

পরবর্তীতে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। এই মামলার পরবর্তী শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল আগামী ১৯ আগস্ট।

আরও পড়ুনঃ  কামড়ে চোরের আঙুল বিচ্ছিন্ন করলেন গৃহবধূ,তবুও মোবাইল নিয়ে পালাল চোর

অর্থাৎ, আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সিরাজুল ইসলামের নাম মামলার নথিতে রয়েছে। তবে এই বিরোধের সঙ্গে তিনজনের হত্যাকাণ্ডের কোনো সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটি এখনো নিশ্চিত নয়।

আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক বলেন, আব্দুস সাত্তার মামলার প্রতিটি শুনানিতে আদালতে হাজিরা দিতেন। এমনকি হত্যাকাণ্ডের প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি আদালতে উপস্থিত হয়ে শুনানিতে অংশ নিয়েছিলেন।

### সম্পত্তির কাগজপত্র নিয়ে রহস্য

হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় ঘটনাটি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মেঝেতে একটি দলিলের কপি পাওয়ার কথাও জানিয়েছে নিহতের পরিবার।

এ কারণে পরিবারের পক্ষ থেকে সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের বিষয়টি তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি উঠেছে। নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

তাঁর ধারণা, আব্দুস সাত্তারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

তবে এ বিষয়ে এখনো পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য দেওয়া হয়নি। পুলিশ বলছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে সব দিক বিবেচনা করেই তদন্ত চলছে।

### পুলিশের তদন্তে প্রেমের সম্পর্কের তথ্য

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করা হয়। বাবুল পেশায় রংমিস্ত্রির কাজ করত। পাশাপাশি মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করত।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছে, ওই বাড়িতে কাজ করার সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে বাবুল ওই বাসায় যায়। তাহমিনা তাকে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করান। এরপর দরজা বন্ধ করে দুজন একটি কক্ষে যান।

সেখানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়। তখন বাবুলের হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাহমিনার মৃত্যু হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

আরও পড়ুনঃ  সিলেটে ডিবি পরিচয়ে অপহরণের চেষ্টা,গাড়িসহ যুবক আটক

### একে একে তিনজনকে হত্যা

পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম বলেন, তাহমিনার চিৎকার ও শব্দ শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে আসেন। তখন বাবুল তাঁকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করে।

সুরাইয়া বেগমকে আঘাত করার পর তাঁদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে আসেন। তখন তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়।

পুলিশের দাবি, একপর্যায়ে আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী দুজনকেই হত্যা করে বাবুল। পরে সে বাসার বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে।

### কে ছিলেন আব্দুস সাত্তার?

নিহত আব্দুস সাত্তার ছিলেন সিলেটের পরিচিত ব্যবসায়ী। তিনি সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা ছিলেন বলে জানা গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে তিনি রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় স্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। তাঁদের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনা থাকতেন।

আব্দুস সাত্তারের এক ছেলে ও এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এবং দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।

### হত্যার কারণ নিয়ে এখনো প্রশ্ন

একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু এবং বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার তথ্য সামনে আসায় হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে বাবুলের ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। পুলিশের দাবি, ওই সম্পর্কের জেরেই প্রথমে তাহমিনাকে হত্যা করা হয় এবং পরে গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীকে হত্যা করে পালিয়ে যায় বাবুল।

অন্যদিকে, আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি নিয়ে চলমান মামলা, মামলার নথি, খোয়া যাওয়া কাগজপত্র এবং হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক সপ্তাহ পর নির্ধারিত আদালতের শুনানির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

তবে **সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে আব্দুস সাত্তারের সম্পত্তি নিয়ে আইনি বিরোধ থাকলেও ওই বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড হয়েছে—এমন কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।** একইভাবে পুলিশের পক্ষ থেকেও সম্পত্তি বিরোধকে হত্যার কারণ হিসেবে নিশ্চিত করা হয়নি।

আরও পড়ুনঃ  কুলাউড়া সীমান্তের ওপারে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি নিহত

ফলে সিলেটের বহুল আলোচিত এই ট্রিপল মার্ডারের পেছনে আসল কারণ কী—তা জানতে পুলিশি তদন্ত ও পরবর্তী জিজ্ঞাসাবাদের দিকেই এখন নজর সবার।