Dhaka ০৪:০৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড, ২০৪ কোটি ডলারের বেশি শোধ

দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যেই দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। ইআরডির তথ্য বলছে, কোনো পাঁচ মাসের সময়ের হিসাবে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিমাণ।

এর আগে গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

আসল ও সুদে কত টাকা পরিশোধ

ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে সরকার বিদেশি ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করেছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার।

অর্থাৎ পাঁচ মাসে আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত একই সময়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কারণে। সরকারের রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরও এ ধরনের বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রভাব পড়ে।

আগের সরকারের নেওয়া ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধযোগ্য

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে এখন নিয়মিতভাবে আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধের সময় এসেছে।

এর ফলে বর্তমান সরকারের সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি একই সময়ে পরিশোধযোগ্য হওয়ায় সরকারের বৈদেশিক দায় ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ নেওয়ার সময় প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত রিটার্ন এবং ঋণের সুদের হার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুনঃ  ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক বদলি, নতুন দায়িত্বে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ হোসেন

তার মতে, কোনো প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে সেই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ থেকে ভবিষ্যতে কতটা আয় হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের সুফল তৈরি হবে, তা আগে থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ খাতেও বড় আর্থিক দায়

বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণেও সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ভর্তুকিসহ বিভিন্ন ব্যয়ের কারণে এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, পুরোনো এসব দায় একদিকে সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছে। এরপরও বিদেশি ঋণের দায়কে অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নির্বিচারে দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাত ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, ঋণের অর্থ এমন খাতে ব্যবহার করা, যেখান থেকে ভবিষ্যতে আয় বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ঋণ নিয়ে যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায় এবং বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক রিটার্ন আসে, তাহলে ঋণের বোঝা তুলনামূলকভাবে সামলানো সহজ হয়। বিপরীতে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের অর্থ ব্যয় হলে ভবিষ্যতে কিস্তি পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।

কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে

ইআরডির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ২৬৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৭ কোটি ডলারে।

এর পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ বিদেশি ঋণ পরিশোধ আরও বেড়ে ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।

পরিসংখ্যানের এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ একবারে তৈরি হয়নি। বরং কয়েক বছর ধরে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে।

আরও পড়ুনঃ  নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসে তৃণমূলের প্রতিভা খুঁজে আনার আহ্বান ভূমিমন্ত্রীর

মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ

অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর অনেক ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হলেও সেগুলোর কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার পর সরকারের বৈদেশিক দায়ের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বাড়ে। একই সময়ে একাধিক প্রকল্পের ঋণ পরিশোধযোগ্য হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ঋণ নিজে থেকে অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক নয়। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো, শিল্পায়ন কিংবা উৎপাদনশীল খাতে সঠিকভাবে ঋণ ব্যবহার করা হলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কারণ প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না এলে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পুরো চাপ সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ

বিদেশি ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করা একটি দেশের আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারলে উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে দেশের দায় পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা যায়।

অন্যদিকে ঋণ পরিশোধে অনিয়ম দেখা দিলে ভবিষ্যতে নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত, বেশি সুদ কিংবা অন্যান্য আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে বর্তমান সরকার একদিকে পুরোনো ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ঋণ ব্যবস্থাপনা

অর্থনীতির জন্য আগামী দিনগুলোতে বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একদিকে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে।

সরকারের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—ঋণের দায় পরিশোধের পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতণ পরিশোধের তথ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তে থাকা চাপেরই একটি চিত্র তুলে ধরছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ঋণ কতটা নেওয়া হবে এবং সেই অর্থাও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের তথ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তে থাকা চাপেরই একটি চিত্র তুলে ধরছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ঋণ কতটা নেওয়া হবে এবং সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হবে—দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আরও পড়ুনঃ  নতুন ব্যবসা শুরু করেছেন সামিরা খান মাহি
Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড, ২০৪ কোটি ডলারের বেশি শোধ

Update Time : ০১:০৮:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের অর্থনীতিতে বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যেই দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশি মুদ্রায় পরিশোধ করা অর্থের পরিমাণ প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা। ইআরডির তথ্য বলছে, কোনো পাঁচ মাসের সময়ের হিসাবে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ পরিমাণ।

এর আগে গত বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে চলতি বছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এ বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

আসল ও সুদে কত টাকা পরিশোধ

ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে সরকার বিদেশি ঋণের আসল বাবদ পরিশোধ করেছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার। অন্যদিকে সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার।

অর্থাৎ পাঁচ মাসে আসল ও সুদ মিলিয়ে মোট ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলার পরিশোধ হয়েছে। গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে সরকারকে।

অর্থনীতির জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মূলত একই সময়ে পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং নতুন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কারণে। সরকারের রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপরও এ ধরনের বড় অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রভাব পড়ে।

আগের সরকারের নেওয়া ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধযোগ্য

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, গত দেড় দশকে বিভিন্ন বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। এসব ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ফলে এখন নিয়মিতভাবে আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধের সময় এসেছে।

এর ফলে বর্তমান সরকারের সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ আরও দৃশ্যমান হয়েছে। বিশেষ করে বড় প্রকল্পগুলোর ঋণের কিস্তি একই সময়ে পরিশোধযোগ্য হওয়ায় সরকারের বৈদেশিক দায় ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।

সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের জন্য ব্যাপকভাবে ঋণ নেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ নেওয়ার সময় প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত রিটার্ন এবং ঋণের সুদের হার যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি বলে তিনি মনে করেন।

আরও পড়ুনঃ  ওসমানী হাসপাতালের পরিচালক বদলি, নতুন দায়িত্বে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ হোসেন

তার মতে, কোনো প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হলে সেই অর্থনৈতিক বিনিয়োগ থেকে ভবিষ্যতে কতটা আয় হবে এবং দেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের সুফল তৈরি হবে, তা আগে থেকেই মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ খাতেও বড় আর্থিক দায়

বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণেও সরকারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক দায় তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন নীতিনির্ধারকেরা। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, ক্যাপাসিটি চার্জ এবং ভর্তুকিসহ বিভিন্ন ব্যয়ের কারণে এ খাতে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য, পুরোনো এসব দায় একদিকে সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে নতুন বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে হচ্ছে। ফলে সীমিত সম্পদের মধ্যে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখা বর্তমান সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার একটি দুর্বল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পেয়েছে। এরপরও বিদেশি ঋণের দায়কে অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ভবিষ্যতে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবিষ্যতে নির্বিচারে দেশি-বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বিনিয়োগের বিপরীতে সম্ভাব্য রিটার্ন এবং ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাত ও ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে, ঋণের অর্থ এমন খাতে ব্যবহার করা, যেখান থেকে ভবিষ্যতে আয় বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

নীতিনির্ধারকদের মতে, ঋণ নিয়ে যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যায় এবং বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক রিটার্ন আসে, তাহলে ঋণের বোঝা তুলনামূলকভাবে সামলানো সহজ হয়। বিপরীতে অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণের অর্থ ব্যয় হলে ভবিষ্যতে কিস্তি পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।

কয়েক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে

ইআরডির পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের বিপরীতে বাংলাদেশ পরিশোধ করেছিল ২৬৭ কোটি ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩৭ কোটি ডলারে।

এর পরের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ বিদেশি ঋণ পরিশোধ আরও বেড়ে ৪০৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪৯ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় সর্বশেষ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে।

পরিসংখ্যানের এই ধারাবাহিকতা থেকে বোঝা যায়, বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ একবারে তৈরি হয়নি। বরং কয়েক বছর ধরে নেওয়া বিভিন্ন প্রকল্প ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধের পরিমাণ বেড়েছে।

আরও পড়ুনঃ  ভাইরালের নেশায় শিশু বোনকে নিয়ে ভাইয়ের আপত্তিকর ভিডিও

মেগা প্রকল্পের ঋণ পরিশোধে বাড়ছে চাপ

অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নেওয়া বড় প্রকল্পগুলোর অনেক ঋণ দীর্ঘমেয়াদি হলেও সেগুলোর কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ার পর সরকারের বৈদেশিক দায়ের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বাড়ে। একই সময়ে একাধিক প্রকল্পের ঋণ পরিশোধযোগ্য হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি ঋণ নিজে থেকে অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক নয়। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো, শিল্পায়ন কিংবা উৎপাদনশীল খাতে সঠিকভাবে ঋণ ব্যবহার করা হলে তা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে পারে। তবে ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে এবং সেই বিনিয়োগ থেকে কতটা আয় বা অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কারণ প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত আয় বা অর্থনৈতিক সুফল না এলে ঋণের কিস্তি পরিশোধের পুরো চাপ সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর পড়ে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ

বিদেশি ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করা একটি দেশের আন্তর্জাতিক আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারলে উন্নয়ন সহযোগী ও আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছে দেশের দায় পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা যায়।

অন্যদিকে ঋণ পরিশোধে অনিয়ম দেখা দিলে ভবিষ্যতে নতুন ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন শর্ত, বেশি সুদ কিংবা অন্যান্য আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে।

এ কারণে বর্তমান সরকার একদিকে পুরোনো ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করছে, অন্যদিকে নতুন ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার কথা বলছে।

সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ঋণ ব্যবস্থাপনা

অর্থনীতির জন্য আগামী দিনগুলোতে বিদেশি ঋণ ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একদিকে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান করতে হবে।

সরকারের সামনে তাই মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—ঋণের দায় পরিশোধের পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতণ পরিশোধের তথ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তে থাকা চাপেরই একটি চিত্র তুলে ধরছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ঋণ কতটা নেওয়া হবে এবং সেই অর্থাও বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত পাঁচ মাসে ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ ডলারের বিদেশি ঋণ পরিশোধের তথ্য বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়তে থাকা চাপেরই একটি চিত্র তুলে ধরছে। পুরোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি ভবিষ্যতে নতুন ঋণ কতটা নেওয়া হবে এবং সেই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হবে—দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আরও পড়ুনঃ  গাজীপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক আটকে শ্রমিকদের বিক্ষোভ