
সিলেট মহানগরের রায়নগর আবাসিক এলাকায় আলোচিত ত্রিমুখী হত্যাকাণ্ডে নিহত প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের চার সন্তানই প্রবাসে থাকেন। দুই মেয়ে যুক্তরাজ্যে এবং দুই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। বাবা-মায়ের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পেয়ে দেশে ফিরছেন তারা।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত দম্পতির দুই মেয়ে বৃহস্পতিবার দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তাদের বহনকারী ফ্লাইটটি সকাল সাড়ে ৯টায় অবতরণের কথা থাকলেও বিলম্বের কারণে দুপুর দেড়টার দিকে সিলেটে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। অন্যদিকে নিহতদের ছেলে ও সাবেক ছাত্রদল নেতা আরিফ ইফতেখার শুক্রবার দেশে ফিরবেন।
প্রবাসে থাকা সন্তানদের জন্য বাবা-মায়ের শেষ বিদায়ের এই মুহূর্তটি আরও বেদনাবিধুর হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে সন্তানদের থেকে দূরে থাকলেও প্রবীণ এই দম্পতি রায়নগরের নিজ বাসায় বসবাস করছিলেন। তাদের দেখাশোনার জন্য বাসায় গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে রাখা হয়েছিল।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন অগ্রগতি হয়েছে। ঘাতকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার সকালে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। হত্যার পর নগরের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ছুরিটি ফেলে দিয়েছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছে গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া।
বর্তমানে নিহত আব্দুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের মরদেহ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তাদের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। প্রবাসী সন্তানরা দেশে পৌঁছানোর পর জানাজা শেষে তাদের দাফন সম্পন্ন করা হবে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
গত বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় ঘটে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড। নিহতরা হলেন প্রবীণ ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার, তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং তাদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগম (২৫)।
ঘটনার পরপরই তদন্তে নামে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে শনাক্ত করা হয়। পরে ঘটনার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাকে আটক করে পুলিশ।
কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির জানান, সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাবুলকে শনাক্ত করা হয়। ঘটনার পর সে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে না গিয়ে রায়নগর রাজবাড়ির আক্তার মিয়ার কলোনিতে অবস্থান করছিল। পরে সাদাপোশাকে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, আটকের সময় বাবুলের পরনে লাল রঙের টি-শার্ট ছিল। তার হাতেও ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের সঙ্গে বাবুলের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ঘটনার দিন সকালে তাহমিনার সম্মতিতেই বাবুল ওই বাসায় প্রবেশ করে। সেখানে তাদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাবুল ধারালো ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
তাহমিনার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাকেও ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর ভেতর থেকে দরজা লক করে বাসার ব্যালকনি দিয়ে পালিয়ে যায় বাবুল। পরে বাসার পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি ফেলে দেয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই বৃহস্পতিবার সকালে ওই ছুরি উদ্ধার করা হয়।
কোতোয়ালি থানার ওসি মাইনুল জাকির বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা করার প্রস্তুতি চলছে। নিহতদের মেয়েদের সঙ্গে পুলিশের কথা হয়েছে এবং তারা দেশে ফিরছেন।
চার সন্তানই বিদেশে থাকায় প্রবীণ এই দম্পতির দেখাশোনার দায়িত্ব ছিল গৃহকর্মী তাহমিনার ওপর। সেই গৃহকর্মীর সঙ্গে এক ব্যক্তির সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ঘটনায় শেষ পর্যন্ত প্রাণ হারালেন তিনজন। বাবা-মায়ের এমন নির্মম মৃত্যুর খবর পেয়ে প্রবাস থেকে সন্তানদের দেশে ফেরার ঘটনায় পুরো বিষয়টি আরও হৃদয়বিদারক হয়ে উঠেছে।
এদিকে তিনজনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় রায়নগরসহ পুরো সিলেট নগরে শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি অভিযুক্ত বাবুল মিয়ার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সিলেট প্রতিনিধি 
























