Dhaka ০৫:৫৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা ও পোড়ানো চুড়ির সূত্রে শিক্ষক পরিবারের চার হত্যার রহস্য উদঘাটন এনসিপির জরুরি সংবাদ সম্মেলন সোমবার যুদ্ধের মধ্যেই জ্বালানি নিয়ে বড় সুখবর দিল ইরান মাদ্রাসাছাত্রীকে ধ র্ষ ণের দায়ে দুজনের যাবজ্জীবন ইসলামি বক্তা মিসবাহের ‘১০ নম্বর স্ত্রী’ হতে চান কনটেন্ট ক্রিয়েটর মীম সিলেটে পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান, ২৪ ঘণ্টায় ৭৩ আসামি গ্রেপ্তার রাষ্ট্রপতির একান্ত সচিব হলেন আবু আউয়াল সিলেটের মেয়ে রুবাইয়ার  ৭৩ লাখ ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ অর্জন শাহজালাল বিমানবন্দরে ৩ কেজি কুশসহ ভারতীয় নাগরিক গ্রেপ্তার এয়ার হোস্টেস থেকে পুলিশ কর্মকর্তা, এবার কোটি টাকার জমি কেলেঙ্কারির অভিযোগে বরখাস্ত

প্রেমের বিরোধ, নাকি সম্পত্তির দ্বন্দ্ব—সিলেটের ট্রিপল মার্ডারে দুই ধরনের তথ্য

সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাঁদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের তথ্য। তবে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে আটক বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক এবং শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫) নিহত হন। একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটনায় বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ।

নিহত আব্দুস সাত্তার ব্যবসায়ী এবং সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমও দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।

### সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের তথ্য

নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থলের মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া গেছে। রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে বিরোধ ও মামলা চলছিল বলে জানা গেছে।

নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার।

২০২৩ সালে ওই সম্পত্তি নিয়ে তিনি স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। আগামী ১৯ আগস্ট মামলাটির শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল।

আরও পড়ুনঃ  দিনের আলোতে ট্রিপল মার্ডার, চুরি-ডাকাতি নাকি পারিবারিক বিরোধ—তদন্তে ৩ বিষয়

আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি মামলার শুনানিতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, আব্দুস সাত্তারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

### পুলিশের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের কারণ

তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এখন পর্যন্ত ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, আটক বাবুল মিয়ার সঙ্গে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বাবুল ওই বাসায় আগে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান বাবুল। তাহমিনা দরজা খুলে তাঁকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। পরে দরজা বন্ধ করে তারা একটি কক্ষে যান।

সেখানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয় বলে পুলিশকে জানিয়েছেন বাবুল। একপর্যায়ে তাঁর হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি।

পরে শব্দ পেয়ে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তাঁদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান।

ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিখোঁজ হওয়া এবং আব্দুস সাত্তারের চলমান সম্পত্তি মামলা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সিলেটের আলোচিত এই ট্রিপল মার্ডারের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ, নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো যোগসূত্র রয়েছে—তদন্ত শেষে সেটিই এখন পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায়।

Tag :
জনপ্রিয় পোস্ট

খেজুরের বিচি, কামড়ানো শসা ও পোড়ানো চুড়ির সূত্রে শিক্ষক পরিবারের চার হত্যার রহস্য উদঘাটন

প্রেমের বিরোধ, নাকি সম্পত্তির দ্বন্দ্ব—সিলেটের ট্রিপল মার্ডারে দুই ধরনের তথ্য

Update Time : ১০:১৯:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬

সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাঁদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় নতুন করে সামনে এসেছে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের তথ্য। তবে পুলিশের প্রাথমিক ভাষ্য অনুযায়ী, গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে আটক বাবুল মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক এবং শারীরিক সম্পর্কের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে বিরোধ থেকেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত।

বুধবার (১২ আগস্ট) সকাল ৯টার দিকে রায়নগর রাজবাড়ি এলাকার মিতালী ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় আব্দুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহকর্মী তাহমিনা (২৫) নিহত হন। একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটনায় বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ।

নিহত আব্দুস সাত্তার ব্যবসায়ী এবং সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। একসময় তিনি কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমও দীর্ঘদিন ধরে ওই বাসায় বসবাস করছিলেন। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।

### সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের তথ্য

নিহত পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার পর বাসা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া গেছে। ঘটনাস্থলের মেঝেতে একটি দলিলের কপিও পাওয়া গেছে। রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের সঙ্গে বিরোধ ও মামলা চলছিল বলে জানা গেছে।

নিহত আব্দুস সাত্তারের আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক জানান, রিকাবীবাজারের পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে বাসা ও স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার।

২০২৩ সালে ওই সম্পত্তি নিয়ে তিনি স্বত্ব মামলা করেন। মামলাটির নম্বর ২১১/২৩। পরে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। ওই মামলায় আব্দুস সাত্তারকে বিবাদী করা হয়। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩। আগামী ১৯ আগস্ট মামলাটির শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল।

আরও পড়ুনঃ  গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে এলোপাতাড়ি গুলি,

আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিক বলেন, প্রতিটি শুনানিতে আব্দুস সাত্তার আদালতে হাজিরা দিতেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও তিনি মামলার শুনানিতে আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

নিহতের পরিচিত বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তদন্তে গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাঁর ধারণা, আব্দুস সাত্তারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।

### পুলিশের ভাষ্যে হত্যাকাণ্ডের কারণ

তবে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এখন পর্যন্ত ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানান, আটক বাবুল মিয়ার সঙ্গে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বাবুল ওই বাসায় আগে রংমিস্ত্রির কাজ করতেন এবং মাঝে মাঝে কসাইয়ের কাজও করতেন।

পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ৯টার দিকে তাহমিনার সঙ্গে দেখা করতে ওই বাসায় যান বাবুল। তাহমিনা দরজা খুলে তাঁকে ভেতরে ঢুকিয়ে দেন। পরে দরজা বন্ধ করে তারা একটি কক্ষে যান।

সেখানে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয় বলে পুলিশকে জানিয়েছেন বাবুল। একপর্যায়ে তাঁর হাতে থাকা ছুরি দিয়ে তাহমিনাকে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে পুলিশের দাবি।

পরে শব্দ পেয়ে সুরাইয়া বেগম এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। তাঁদের চিৎকার শুনে আব্দুস সাত্তার এগিয়ে এলে তাঁকেও ছুরি দিয়ে আঘাত করা হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর বাবুল বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান।

ঘটনার পর সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে আটক করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এদিকে ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিখোঁজ হওয়া এবং আব্দুস সাত্তারের চলমান সম্পত্তি মামলা নিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সিলেটের আলোচিত এই ট্রিপল মার্ডারের পেছনে কেবল ব্যক্তিগত বিরোধ, নাকি সম্পত্তিসংক্রান্ত কোনো যোগসূত্র রয়েছে—তদন্ত শেষে সেটিই এখন পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায়।