
সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেত্রী হুমায়রা নূরের ‘সিলেটিরা শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না’ এবং সিলেটি ভাষাকে ‘সিলেটি বাংলা’ হিসেবে উল্লেখ করার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট জুড়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ওই বক্তব্যের সমালোচনা করে সিলেটি ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বক্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করেন। অনেকে সিলেটি ভাষার স্বাতন্ত্র্য, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিতে সিলেটের অবদানের কথা তুলে ধরে হুমায়রা নূরের বক্তব্যকে অজ্ঞতাপ্রসূত ও আঞ্চলিক বিদ্বেষমূলক বলে সমালোচনা করেছেন।
বিপিএলের সিলেট সিক্সার্সের স্বত্বাধিকারী ফাহিম আল চৌধুরী এক ফেসবুক পোস্টে হুমায়রা নূরের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন।
তিনি লেখেন, ‘আপনার মুখে শুদ্ধ বাংলার বড় বড় বুলি শোভা পায় না, যখন আপনার চিন্তা আঞ্চলিক বিদ্বেষে কলুষিত এবং বক্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার থেকে বঞ্চিত।’
ফাহিম আল চৌধুরী আরও লেখেন, ‘ভাষা শুদ্ধ হওয়ার আগে মন, জ্ঞান ও আচরণ শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একটি অঞ্চলের মানুষের উচ্চারণ নিয়ে উপহাস করা কোনো যোগ্যতা নয়, এটি আপনার অজ্ঞতা, সংকীর্ণতা ও মানসিক দীনতারই প্রকাশ।’
সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি নিজেদের গর্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, ইতিহাস আছে, অবদান আছে এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো গৌরব আছে। আমাদের ভাষা নিয়ে আমরা লজ্জিত নই, আমরা গর্বিত।’
‘সিলেটি ভাষা সম্পর্কে তিনি আসলে কিছুই জানেন না’
সিলেটের সাংবাদিক কামকামুর রুনুও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমায়রা নূরের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, টেলিভিশন টকশোতে দেওয়া ওই বক্তব্য সিলেটবাসীকে মর্মাহত করেছে।
নিজের ফেসবুক পোস্টে কামকামুর রুনু লেখেন, ‘সম্প্রতি একটি টেলিভিশন টকশোতে এনসিপি নেত্রী হুমায়রা নূর “সিলেটিরা শুদ্ধ বাংলা বলতে পারে না” এবং সিলেটি ভাষাকে “সিলেটি বাংলা” বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা সিলেটবাসীকে মর্মাহত করেছে।’
সিলেটি ভাষা সম্পর্কে হুমায়রা নূরের বক্তব্যকে অজ্ঞতাপ্রসূত উল্লেখ করে তিনি আরও লেখেন, ‘সিলেটি ভাষা সম্পর্কে তিনি আসলে কিছুই জানেন না। এটি যে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ভাষা, সেটিও তাঁর অজানা।’
কামকামুর রুনুর ভাষ্য, হুমায়রা নূরের বক্তব্য শুধু সিলেটের মানুষের মধ্যেই নয়, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা সিলেটিদের মধ্যেও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তিনি সিলেটবাসীর কাছে ওই বক্তব্যের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান।
সিলেটের ভাষা ও সাহিত্যিক ঐতিহ্য তুলে ধরলেন লাভলী দেব
এদিকে সঙ্গীতশিল্পী লাভলী দেবও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিলেটের ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে হুমায়রা নূরের বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।
তিনি তাঁর ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘সিলেটের মানুষকে শুধু তাদের আঞ্চলিক উচ্চারণ দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়।’
সিলেটের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের কথা উল্লেখ করে লাভলী দেব লেখেন, ‘যে মাটিতে সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো কথাশিল্পী জন্মেছেন, যে মাটিতে রাধারমণ ও হাছন রাজার মতো সাধক কবিরা বাংলা ভাষার ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করেছেন, যে ভূখণ্ডে যুগের পর যুগ গবেষণা, শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা হয়েছে; সেই সিলেটের মানুষের ভাষা ও জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্য নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘আঞ্চলিক ভাষা আমাদের শিকড়, আর শুদ্ধ বাংলা আমাদের বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিচয়ের অংশ। সিলেট তাই শুধু চায়ের দেশ নয়; সিলেট জ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ভাষারও এক গর্বিত জনপদ।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ
হুমায়রা নূরের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকে মনে করছেন, একটি অঞ্চলের মানুষের ভাষা বা উচ্চারণকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি অসম্মানজনক।
প্রতিক্রিয়ায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে ভাষা ও উচ্চারণের ভিন্নতা রয়েছে। এসব আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষা দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কোনো অঞ্চলের ভাষাকে খাটো না করে এর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে সম্মান করা প্রয়োজন।
সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়ায় বক্তারা বাংলাদেশের বহুভাষিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সিলেটের ভাষা, ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা না করে এর স্বাতন্ত্র্যকে সম্মানের সঙ্গে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে, হুমায়রা নূরের বক্তব্য নিয়ে সিলেটজুড়ে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিলেট প্রতিনিধি 



















